জনসেবা
প্রশাসক নিয়োগ আদৌ কি নাগরিক সেবা নিশ্চিত করবে?
অমিতোষ পাল
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৯:১৬
সম্প্রতি দেশের ছয় সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে এসব সিটি করপোরেশনে প্রশাসকরাই দায়িত্ব পালন করছেন। সিটি করপোরেশনগুলোতে প্রশাসক বসানোর নজির নতুন নয়। সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর একাধিকবার প্রশাসক বসানো হয়েছে। কিন্তু নতুন করে আবারও প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ায় একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এবার প্রশাসক বসানোর ফলে কি নাগরিক সেবা বাড়বে, নাকি এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে?
সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার বাসিন্দারা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অন্তত ১২ ধরনের নাগরিক সেবা পেয়ে থাকেন। জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন সনদ, ওয়ারিশ সনদ, নাগরিকত্বের প্রত্যয়নপত্র, দ্বিতীয় বিয়েতে আবদ্ধ না হওয়া, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতার সত্যায়িত সনদ ও বিভিন্ন প্রত্যয়ন, জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার তালিকায় নাম তোলা প্রভৃতি। এসব সেবা মূলত সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরদের মাধ্যমে নাগরিকরা পেয়ে থাকেন। কাউন্সিলরদের অভিভাবক হিসেবে কাজ করেন মেয়র বা প্রশাসক। কিন্তু প্রশাসক বা মেয়র সরাসরি নাগরিকদের এসব সেবা দিতে পারেন না।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর একযোগে দেশের ১২টি সিটি করপোরেশন ও ৩৩০টি পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলরদের বরখাস্ত করা হয়। এসব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় চার হাজারেরও বেশি জনপ্রতিনিধি ছিল। একই সঙ্গে সব উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও সদস্যদেরও বরখাস্ত করা হয়। এরপরই সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে বসানো হয় প্রশাসক। তখনই নাগরিক সেবার ভোগান্তি চরমে ওঠে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে বিএনপি নেতা ডা. শাহাদত হোসেন নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করে তাঁর মেয়র পদ ফিরে পান। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেও একইভাবে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন মামলায় জিতলেও অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে মেয়র পদে বসতে দেয়নি।
এদিকে মেয়র-কাউন্সিলরদের বরখাস্তের পর নাগরিক সেবা শিকেই উঠলে সেবা স্বাভাবিক করতে স্থানীয় সরকারগুলোতে নির্বাচনের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। তখন জাতীয় নির্বাচন আগে দাবি করে বেঁকে বসে বিএনপি। ফলে নির্বাচন করা আর সম্ভব হয়নি।
নগর সাংবাদিকতা করার সুবাদে তখন দেখতে পেয়েছি কাউন্সিলর না থাকার করণে মানুষ কত ধরনের ভোগান্তিতে পড়েছে। একটি জন্মসনদ পেতে এক মাস ধরে কর্মকর্তাদের দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে দেখেছি। কারণ কাউন্সিলরদের কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের, যারা আনিক নামে পরিচিত। কিন্তু ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে আনিকের পদ ১০টি করে ২০টি। আবার অনেক আনিককে একাধিক অঞ্চলের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। তাদের দাপ্তরিক অন্য কাজ থাকায় তারা দুই সিটি করপোরেশনে থাকা ১২৬টি ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবা দিতে পারেননি। আবার তারা স্থানীয় মানুষের পরিচিত না হওয়ার কারণে অনেকে সনদও ঠিকমতো পাননি। কাউন্সিলর না থাকায় কত ধরনের যে বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছে নগরবাসীকে, তার ইয়ত্তা নেই। এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে ঘন ঘন হয়েছে প্রশাসক বদল। আবার যেসব আমলা প্রশাসক পদে বসেছেন তারা কখনও মাঠ পর্যায়ের সমস্যা জানার চেষ্টা করেননি। এর বাইরে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে এক বছরের চুক্তিতে বসানো হয় পরিবেশকর্মী ও জুলাই যোদ্ধা মোহাম্মদ এজাজকে। কিছুদিন যেতেই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠে নানা দুর্নীতির অভিযোগ। এখন তিনি দুদকে হাজিরা দিচ্ছেন। বিদেশযাত্রায় পড়েছে নিষেধাজ্ঞা।
ধারণা করেছিলাম বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নাগরিক ভোগান্তির কথা চিন্তা করে সিটি করপোরেশনগুলোতে প্রথমেই নির্বাচনের আয়োজন করবে। স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে নির্বাচন কমিশনকে একটি চিঠিও দেওয়া ছিল। স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী হিসেবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দায়িত্ব নিয়ে চেয়ারে বসার পর সাংবাদিকদেরও বলেছিলেন, আসন্ন ঈদুল ফিতরের পরপরই সিটি করপোরেশনগুলোতে নির্বাচন আয়োজন করবে সরকার। ভুক্তভোগী নগরবাসী আশায় বুক বেঁধেছিলেন। কিন্তু চেয়ারে বসার পাঁচ দিন যেতে না যেতেই তাঁর মন্ত্রণালয় থেকে ছয় সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগের আদেশ জারি করা হয়। এতেই সন্দেহ তৈরি হলো, সিটি করপোরেশন নির্বাচন কি বিলম্বিত করতে চায় সরকার? এটা করে কি কোনো রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায়?
ইউনূস সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সিটি করপোরেশন-পৌরসভায় নির্বাচন দিতে চেয়েছিল, তখন প্রশ্ন উঠেছিল, তারা কি এনসিপি, জুলাই যোদ্ধা বা ইউনূস-অনুগতদের স্থানীয় সরকারগুলোতে জায়গা করে দিতে চায়। এ জন্যই তখন বিএনপি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু এবার যেহেতু ঢাকা শহরে জামায়াত তিনটি আসন পেয়েছে, এনসিপি পেয়েছে একটি। এতেই কি ভয় পেয়েছে বিএনপি? যে কারণে নির্বাচন না দিয়ে দলীয় লোকদের প্রশাসক পদে বসিয়ে সুবিধা দিয়ে নির্বাচনী মাঠ প্রস্তুত করতে চায়। তা না হলে তারা বিজয়ী হতে পারবে না? এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে নাগরিক স্বার্থের কথা না ভেবে দলীয় স্বার্থই কি তাদের কাছে বড় হয়ে গেল?
নানা তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে এ দেশের মানুষ বেশির ভাগ জনপ্রতিনিধিকে খুব একটা ভালো চোখে দেখেন না। তারপরও দিন শেষে জনপ্রতিনিধিই শেষ কথা। কমবেশি হলেও তাদেরকে মানুষের কাছে যেতে হয় বা যেতে বাধ্য হন। একজন কাউন্সিলর এলাকাবাসীর সমস্যা যতটা বোঝেন, একজন আমলা সেটা বোঝেন না। আবার বুঝতে বুঝতেই বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যান। কাজেই যেসব আনিক দিয়ে এখন নাগরিক সেবা চলছে তাতে ভোগান্তি কমবে না। যদিও এখন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে নাগরিক ভোগান্তি লাঘবের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু যতক্ষণ না নগরবাসী কাউন্সিলর পাবে ততক্ষণ নাগরিক সেবা নিশ্চিত হবে না। এর সর্বশেষ প্রমাণ হচ্ছে রাজধানীতে বর্তমান সময়ে মশার দৌরাত্ম্য।
সর্বশেষ বলতে চাই, বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের অধীনেই স্থানীয় সরকার পরিচালিত হতে হবে। অতএব স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বিত করা সংবিধানের চেতনার পরিপন্থি। তাই দ্রুত সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে নির্বাচন আয়োজন করুন। এতে নাগরিক সেবা একটু হলেও বাড়বে। জনপ্রতিনিধিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে আর প্রশাসক দেখতে চাই না।
অমিতোষ পাল, বিশেষ প্রতিনিধি, সমকাল
[email protected]
- বিষয় :
- নাগরিক সেবা
- প্রশাসক
