অন্যদৃষ্টি
পোশাকই পুলিশের পরিচয়?
ইফতেখারুল ইসলাম
প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬ | ০৬:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের ভূমিকার প্রেক্ষিতে বাহিনীটির সংস্কার আলোচনায় আসে। অন্তর্বর্তী সরকার এ লক্ষ্যে একটি সংস্কার কমিশনও গঠন করেছিল। একই সঙ্গে পুলিশের পোশাকেও পরিবর্তন আনে। আগে নীল রং ছিল, যা বাদামি করা হয়। এতে পুলিশকে আগের মতো উজ্জ্বল ও দৃষ্টিগোচর মনে হয় না। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা দেখা গেছে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সেই পোশাক আবার আলোচনায় আসে। এরই মধ্যে পোশাক নিয়ে পুলিশ সদরদপ্তর থেকে একটা জরিপ করা হয়েছে, যেখানে বেশির ভাগই আগের ইউনিফর্মে ফিরে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
খেয়াল করলে দেখা যাবে, আগের পোশাকে পুলিশকে অনেক বেশি উজ্জ্বল যেমন দেখাত, তেমনি একটা ভয়ের আবহ থাকত। এই ভয় মূলত সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে। এই বিবেচনায় পরিবর্তিত পোশাকটি বহাল রাখাটাই যৌক্তিক মনে করি। পুলিশের ইউনিফর্মের পরিবর্তনকে কেউ দেখছেন সময়োপযোগী সংস্কার হিসেবে, কেউবা অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা হিসেবে। প্রশ্ন হলো, কেবল দৃশ্যমানতার দিক বিবেচনা করেই কি সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত, নাকি এর পেছনের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক তাৎপর্যও আছে?
ইউনিফর্ম কেবল পোশাক নয়; এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের দৃশ্যমান প্রতীক। আগের নীল ইউনিফর্মে পুলিশকে অনেক বেশি উজ্জ্বল ও দৃষ্টিগোচর মনে হতো। দূর থেকে সহজেই চেনা যেত; জনসমাগমে আলাদা করে চোখে পড়ত। একই সঙ্গে এ কথাও অস্বীকার করা যাবে না, সেই উজ্জ্বল উপস্থিতির সঙ্গে একটি ভয়ের আবহও জড়িয়ে ছিল। দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, হয়রানি বা দমনমূলক আচরণের অভিযোগ পুলিশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ফলে ইউনিফর্মের উজ্জ্বলতা অনেক সময় নিরাপত্তার চেয়ে আতঙ্কের প্রতীক হিসেবেই বেশি কাজ করেছে।
এ প্রেক্ষাপটে বাদামি রঙের নতুন ইউনিফর্মকে একটি প্রতীকী পুনর্গঠন হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি তুলনামূলক সংযত, কম আক্রমণাত্মক এবং ‘মিলিটারি’ ভাব কম বহন করে। জনবান্ধব পুলিশিংয়ের যে ধারণা, পুলিশ জনগণের বন্ধু– তা প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে বাহ্যিক উপস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিফর্ম যদি এমন বার্তা দেয়– পুলিশ সমাজের অংশ; সমাজের ওপর কর্তৃত্বকারী কোনো দূরবর্তী শক্তি নয়, তাহলে তা আস্থার পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
তবে এর ভিন্ন দিকও রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি নির্দিষ্ট মাত্রার দৃশ্যমানতা প্রয়োজন। উজ্জ্বল ইউনিফর্ম অপরাধ দমনে মনস্তাত্ত্বিক ভূমিকা রাখে; সম্ভাব্য অপরাধীরা সহজে পুলিশের উপস্থিতি টের পায়। বাদামি রং তুলনামূলক কম চোখে পড়ে। এতে কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, সন্ত্রাসী বা সংঘবদ্ধ অপরাধীরা পুলিশকে আগের মতো গুরুত্ব নাও দিতে পারে। মাঠ পর্যায়ে দ্রুত শনাক্তকরণের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
কিন্তু মনে রাখতে হবে, অপরাধ দমন বা জনআস্থা– কোনোটিই কেবল পোশাকনির্ভর নয়। পুলিশের আচরণ, পেশাদারিত্ব, জবাবদিহিতা ও ন্যায়নিষ্ঠাই শেষ পর্যন্ত তাদের মর্যাদা নির্ধারণ করে। আগের ইউনিফর্মে যদি ভয়ের সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে থাকে, তবে কেবল সেই রঙে ফিরে যাওয়াই সমাধান নয়। বরং প্রয়োজন আচরণগত সংস্কার, মানবাধিকার-সংবেদনশীল প্রশিক্ষণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
জরিপে অধিকাংশ যদি আগের ইউনিফর্মে ফেরার পক্ষেও থাকেন, তবু নীতিনির্ধারণে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি। নতুন ইউনিফর্ম গ্রহণযোগ্যতা পেতে হয়তো আরও সময়ের দরকার। পরিবর্তনের সঙ্গে প্রাথমিক অস্বস্তি থাকেই। ধীরে ধীরে অভ্যস্ততা তৈরি হবে।
অতএব, কেবল উজ্জ্বলতা বা দৃশ্যমানতার যুক্তিতে নয়, বরং পুলিশ-জনতার সম্পর্ক পুনর্গঠনের বৃহত্তর লক্ষ্য সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। ভয়ের প্রতীক নয়, আস্থার প্রতীক হিসেবে পুলিশকে দেখতে চাইলে পোশাকের এই পরিবর্তন বহাল রাখা দরকার বলে মনে করি। এ ছাড়া পুলিশ সংস্কারে অন্যান্য দিকও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে।
ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- ইফতেখারুল ইসলাম
