ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

পাহাড় কাটা থামছে না কেন?

পাহাড় কাটা থামছে না কেন?
×

ইফতেখারুল ইসলাম

প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৬ | ০৭:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের পাশে রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের ছাইল্ল্যাতলী এলাকায় প্রায় পাঁচ একর পাহাড় কেটে ফেলার ঘটনা আবারও আমাদের সামনে এক পুরোনো বাস্তবতা তুলে ধরেছে। বাংলাদেশে পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে আইন থাকলেও তার প্রয়োগ প্রায়ই অকার্যকর। সমকালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইতোমধ্যে পাহাড়টির প্রায় ৭০ শতাংশ কেটে ফেলা হয়েছে। সেখানে বসতি ও বহুতল ভবন নির্মাণের প্রস্তুতিও চলছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিমানা কিংবা বন বিভাগের মামলা– কোনোটিই এই চক্রকে থামাতে পারছে না।

দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, বিশেষত কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়গুলো কেবল ভূ-প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত ভারসাম্যের অংশ। পাহাড় প্রাকৃতিকভাবে মাটির স্থিতি বজায় রাখে; বৃষ্টির পানি ধারণ করে এবং জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। অথচ গত কয়েক দশকে উন্নয়ন, বসতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এই পাহাড়গুলো ধারাবাহিকভাবে কাটা হচ্ছে। এর ফলে পাহাড়ধস, বন্যা এবং ভূমিক্ষয়ের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে, যার মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই।

ছাইল্ল্যাতলী এলাকার ঘটনাটি নতুন নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সাম্প্রতিক উদাহরণ মাত্র। পাহাড় কাটা সাধারণত রাতের অন্ধকারে বা স্থানীয় প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে শুরু হয়। কিছুদিনের মধ্যেই তা প্রকাশ্য রূপ নেয়। কারণ, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের পেছনে প্রায়ই প্রভাবশালী রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা থাকে। স্থানীয়রা যখন অভিযোগ করেন, একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতার নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ চক্র পাহাড় কাটছে, তখন প্রশ্ন ওঠে– আইনের প্রয়োগ কি সবার জন্য সমান?

বাংলাদেশে পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে আইন রয়েছে এবং তা যথেষ্ট কঠোর। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া পাহাড় কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। বাস্তবে দেখা যায়, জরিমানা বা মামলা অনেক সময় এই চক্রগুলোর জন্য বড় কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। অনেক ক্ষেত্রে জরিমানার অঙ্ক তুলনামূলক কম; আবার মামলার বিচার প্রক্রিয়াও দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে যায়। ফলে অবৈধভাবে পাহাড় কেটে জমি বিক্রি বা নির্মাণের মাধ্যমে যে অর্থনৈতিক লাভ হয়, তার তুলনায় শাস্তি প্রায় নগণ্য।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব। পাহাড় সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন– তিনটি পক্ষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, এক সংস্থা অভিযান চালালেও অন্য সংস্থার সমর্থন বা কার্যকর অনুসরণ না থাকায় তা দীর্ঘস্থায়ী ফল দেয় না। ফলে পাহাড় কাটার কাজ কিছুদিন বন্ধ থাকলেও নতুন করে শুরু হয়ে যায়।
পাহাড় রক্ষা শুধু পরিবেশবাদীদের দাবি নয়। এটি জননিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। কক্সবাজার অঞ্চলে অতীতে একাধিকবার পাহাড়ধসে মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে– পাহাড় ধ্বংসের ফল শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই উন্নয়ন বা বসতির নামে পাহাড় কেটে ফেলা আসলে দীর্ঘ মেয়াদে নিজেদেরই ক্ষতি ডেকে আনা।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা। পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব যা-ই হোক না কেন, আইনের প্রয়োগে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। পাশাপাশি পাহাড় কেটে তৈরি হওয়া অবৈধ স্থাপনা ভেঙে ফেলার মতো দৃশ্যমান পদক্ষেপও প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন কর্মকাণ্ডে আশকারা না পায়।
সব শেষে বলতে হয়, পাহাড় একবার কেটে ফেললে তা আর সহজে ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নে সময়মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ছাইল্ল্যাতলীর পাহাড় কাটার ঘটনা যদি আবারও শাস্তিহীন থেকে যায়, তাহলে এটি শুধু একটি পাহাড়ের ক্ষতি হবে না। এটি হবে আইনের শাসন এবং পরিবেশ সুরক্ষার প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার ওপর বড় একটি প্রশ্নচিহ্ন।

ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল 

আরও পড়ুন

×