প্রযুক্তি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সফটওয়্যার ব্যবসা
মশিউর রহমান
মশিউর রহমান
প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১১ | আপডেট: ১১ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বের প্রযুক্তি অর্থনীতি গত দুই দশকে একটি নির্দিষ্ট মডেলের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। এটি হলো সফটওয়্যার এজ অ্যা সার্ভিস (স্যাস মডেল)। এই মডেলে সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে, ব্যবহারকারীরা সেটি অনলাইনে ব্যবহার করে এবং মাসিক বা বার্ষিক সাবস্ক্রিপশন দিয়ে সেই পরিষেবার দাম পরিশোধ করে। অর্থাৎ সফটওয়্যারটিই একটি সার্ভিস হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা করে। বহির্বিশ্বে সেলসফোর্স, শপিফাই, স্লাক, জুম, হাবস্পট– এসব কোম্পানি এই স্যাস মডেলের মাধ্যমে বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশে এমনই স্যাস মডেলের কিছু প্রতিষ্ঠান হলো রকমারি, দারাজ, আজকের ডিল, চালডাল কিংবা সাজগোজ।
ভাবনার বিষয় হলো, প্রযুক্তির ইতিহাসে একটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন– কোনো প্রযুক্তিই স্থায়ী নয়। প্রতিটি প্রযুক্তি নতুন প্রযুক্তির কাছে কোনো একদিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বর্তমানে এই স্যাস মডেল যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তার নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যাকে সংক্ষেপে এআই বলা হয়। এআই শুধু নতুন একটি সফটওয়্যার নয়; এটি সফটওয়্যার তৈরির পদ্ধতিই বদলে দিচ্ছে। আগে একটি সফটওয়্যার তৈরি করতে বড় একটি ইঞ্জিনিয়ারিং দল, দীর্ঘ সময় এবং বিপুল অর্থের বিনিয়োগ দরকার হতো। এখন এআই কোড লিখতে পারে, ডেটা বিশ্লেষণ করতে পারে, এমনকি সফটওয়্যার ডিজাইনও করতে পারে। ফলে অনেক ছোট স্যাস কোম্পানির অস্তিত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠছে।
একটি দরজা বন্ধ হলে যেমন আরেকটি দরজা খুলে যায়; তেমন একই সঙ্গে নতুন ধরনের ব্যবসা মডেলও জন্ম নিচ্ছে। প্রযুক্তি অর্থনীতির এই পরিবর্তনের যুগে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে এসেছে– কোন সফটওয়্যার ব্যবসা হারিয়ে যাবে, আর কোন নতুন ব্যবসা আগামী দশকে বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক শিল্পে পরিণত হবে?
বর্তমানে অনেক স্যাস কোম্পানি আসলে বড় এআই মডেলের ওপর একটি ছোট ইন্টারফেস তৈরি করে ব্যবসা করছে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা এদের বলেন র্যাপার স্যাস। উদাহরণস্বরূপ, কিছু স্টার্টআপ আছে, যেগুলো এআই দিয়ে ব্লগ লেখা, সামাজিক মাধ্যমের ক্যাপশন তৈরি বা পণ্যের বিবরণ লিখে দেওয়ার মতো কাজ করে। কিন্তু আজকের এআই, যেমন চ্যাটজিপিটি, ক্লড বা জেমিনি– এসব কাজ একাই করতে পারে। এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে যদি মূল এআই প্ল্যাটফর্মই সেই সুবিধা দেয়, তাহলে আলাদা স্যাস কোম্পানির প্রয়োজন কোথায়? এটিই বর্তমান অর্থনীতির বাস্তবতা। অনেক ছোট স্যাস কোম্পানি একটি মাত্র ফিচারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এআই যুগে একটি ফিচার সহজেই বড় প্ল্যাটফর্মের অংশ হতে পারে।
প্রথম বলেছিলাম, একটি দরজা বন্ধ হলে অন্য দরজা খুলে যায়। সেভাবে সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে নতুন কিছু ব্যবসার মডেল উঠে আসছে।
প্রথমত, এআই এজেন্ট ইকোনমি। ভবিষ্যতে অনেক কাজ এআই এজেন্ট দ্বারা পরিচালিত হবে। একটি এআই এজেন্ট ভ্রমণ পরিকল্পনা করতে পারে, পণ্য কিনতে পারে, এমনকি দরদামও করতে পারে। ফলে এআই এজেন্ট মার্কেটপ্লেস একটি নতুন ব্যবসাতে পরিণত হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা কাঠামোর ব্যবসা। এআই চালাতে বিপুল পরিমাণ কম্পিউটিং শক্তি, জিপিইউ এবং ক্লাউড অবকাঠামো দরকার। এ কারণে এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার কোম্পানি আগামী দশকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

তৃতীয়ত, তথ্যের ব্যবসা। এআই মডেল প্রশিক্ষণের জন্য বড় ও মানসম্পন্ন ডেটা দরকার। যে কোম্পানিগুলো শিল্পভিত্তিক ডেটা সরবরাহ করতে পারবে, তারা বড় ব্যবসা গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
চতুর্থত, বিশেষায়িত এআই সফটওয়্যার। সাধারণ এআই টুলের পরিবর্তে নির্দিষ্ট শিল্পক্ষেত্রের জন্য বিশেষ এআই তৈরি করা হচ্ছে। যেমন স্বাস্থ্যসেবা, আইন, কৃষি বা উৎপাদন শিল্পের জন্য এআই।
পঞ্চমত, এআইভিত্তিক সাইবার সিকিউরিটি। এআই প্রযুক্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার হামলাও বাড়বে। তাই এআইভিত্তিক নিরাপত্তা সফটওয়্যার একটি বড় বাজার তৈরি করতে পারে।
এআই যুগের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো সফটওয়্যার আর শুধু একটি টুল নয়। এটি স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনের ফলে কয়েকটি নতুন ব্যবসা মডেল দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তবে এআই যুগে নতুন প্রতিযোগিতা: সফটওয়্যার নয়, ডিস্ট্রিবিউশন অর্থাৎ কে ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছাতে পারছে। অ্যাপল, গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজনের মতো কোম্পানির শক্তি শুধু তাদের প্রযুক্তি নয়; তাদের প্ল্যাটফর্মে কোটি কোটি ব্যবহারকারী আছে। যদি এআই একটি নতুন সফটওয়্যার তৈরি করে, কিন্তু সেই সফটওয়্যার ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে তার ব্যবসা তৈরি হবে না। এই কারণে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা শুধু সফটওয়্যার তৈরির নয়; এটি হবে ডিস্ট্রিবিউশন এবং ইকোসিস্টেম বা বাস্তুসংস্থানের প্রতিযোগিতা। আগে ব্যবসা মডেল ছিল: সফটওয়্যার এজ অ্যা প্রডাক্ট। এখন ধীরে ধীরে সেটি পরিবর্তিত হচ্ছে: এআই সিস্টে, এজ অ্যা ক্যাপাবিলিটি। অর্থাৎ সফটওয়্যার শুধু একটি পণ্য নয় , বুদ্ধিমান সিস্টেম, যা সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কাজ পরিকল্পনা করতে পারে এবং মানুষের সঙ্গে সহযোগিতা করতে পারে।
প্রযুক্তির ইতিহাসে প্রতিটি বড় পরিবর্তন নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। ইন্টারনেটের জন্মের সময়ও অনেক পুরোনো ব্যবসা হারিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু একই সঙ্গে অ্যামাজন, গুগল এবং ফেসবুকের মতো নতুন কোম্পানি জন্ম নিয়েছিল। এআই যুগেও একই ঘটনা ঘটবে। এই পরিবর্তনের যুগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: আমরা কি শুধু একটি সফটওয়্যার তৈরি করছি, নাকি একটি সম্পূর্ণ সিস্টেম তৈরি করছি? কারণ এআই যুগে ভবিষ্যৎ তাদেরই, যারা শুধু একটি ফিচার নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ বুদ্ধিমান ইকোসিস্টেম তৈরি করতে পারবে।
ড. মশিউর রহমান: ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজার,
ওমরন হেলথকেয়ার সিঙ্গাপুর
[email protected]
- বিষয় :
- মশিউর রহমান
- প্রযুক্তি
