ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ

জ্বালানি সংকটে সাময়িক ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল চাই

জ্বালানি সংকটে সাময়িক ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল চাই
×

হোসেন জিল্লুর রহমান

হোসেন জিল্লুর রহমান

প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৩৭ | আপডেট: ১৩ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ প্রায় দুই সপ্তাহ গড়িয়েছে। যুদ্ধের বহুমাত্রিক প্রভাব ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। এর তাৎক্ষণিক প্রভাব আমাদের জ্বালানি খাতের ওপর পড়েছে। যে কারণে সরকার জ্বালানিসাশ্রয়ী নীতি ঘোষণা করেছে। যুদ্ধের কেন্দ্রে এখন হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের তেল সরবরাহ ব্যবস্থার বড় একটা অংশ এ পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। এই প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজের যাতায়াত কার্যত বন্ধ। এর প্রভাব পড়ছে বিশ্ববাজারে; রাতারাতি বেড়ে গেছে জ্বালানি তেলের দাম। সরকার যদিও জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে না বলছে, কিন্তু তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পরিবহন থেকে শুরু করে উৎপাদন, কৃষি– সব খাতেই পড়বে। বাংলাদেশসহ সব দেশের অর্থনীতিতেই এই ধাক্কা অনুভূত হবে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি পেলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে, যার সরাসরি শিকার হবে সাধারণ মানুষ।

মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ এক ধরনের আগ্রাসন, যার নৈতিক ভিত্তি নেই। এ ধরনের যুদ্ধ থামাতে জাতিসংঘও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এই সংঘাত কতদিন স্থায়ী হবে, এখনও বলা যাচ্ছে না। গত বছরও ১২ দিনের একটি সংঘাত হয়েছিল, যেটি বিভিন্ন পক্ষের ভূ-রাজনৈতিক হিসাবনিকাশে এক পর্যায়ে থেমে গিয়েছিল। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। এবার একটি সর্বাত্মক আগ্রাসনের মাত্রা সামনে এসেছে, যার গন্তব্য এখনও স্পষ্ট নয়। এই সংঘাত দ্রুত থেমে গেলে অর্থনীতিতে সাময়িক একটা ধাক্কা লাগবে বটে, কিন্তু তা মোকাবিলাযোগ্য। তবে এটা যদি এক বছর বা তারও বেশি সময় ধরে চলে, তাহলে পরিণতি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইউক্রেন যুদ্ধের কথা স্মরণ করলেই বোঝা যায়, সেই যুদ্ধ এখনও চলছে এবং এখনও বিশ্ব অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতও যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

প্রশ্ন উঠছে, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার আসল লক্ষ্য  কী? বরং বলা উচিত, আমেরিকার মাধ্যমে ইসরায়েলের লক্ষ্য কী? কারণ ইরানের তরফ থেকে আমেরিকার প্রতি কোনো তাৎক্ষণিক হুমকির কোনো বাস্তব প্রমাণ নেই। তবু আমেরিকা এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর কারও কাছেই নেই। এমনকি ট্রাম্পের উপদেষ্টামণ্ডলীর মধ্যেও এ নিয়ে ঐকমত্য নেই। অনেকে এটাকে একটি ‘ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান’ হিসেবে দেখছেন। মধ্যপ্রাচ্যে একটি ‘স্থায়ী সংঘাতের অবস্থা’ তৈরি করাই হয়তো ইসরায়েলের কৌশলগত লক্ষ্য। সিরিয়া, লিবিয়া, আফগানিস্তানকে দেখলেই বোঝা যায়, এক সময়ের স্থিতিশীল দেশগুলো কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী

সংঘাতের আঁধারে ডুবে গেছে।
বিশ্লেষকরা আরও উদ্বিগ্ন বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভাঙন নিয়ে। একুশ শতকে আমরা ভেবেছিলাম, সভ্যতার অগ্রগতি হচ্ছে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। কিন্তু ২৫ বছর কেটে গেলেও বাস্তবতা হতাশাজনক। এই আগ্রাসনের জাতিসংঘের কোনো রেজল্যুশনের আইনি ভিত্তি নেই। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য এবং ইউরোপের বিভক্ত প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট করে দেয়– আন্তর্জাতিক আইন আজ কার্যত অকার্যকর।

ইউরোপে তিন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী একাই এটাকে ‘আগ্রাসন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। কিছু দেশ ইরানকে তিরস্কার করেছে। বাকিরা সরাসরি আমেরিকা ও ইসরায়েলের পক্ষ নিয়েছে। চীন ও রাশিয়া নিন্দা জানালেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমেরিকার যে আধিপত্যবাদী ভূমিকা, তা আবার নতুনভাবে সামনে আসছে। ট্রাম্পের বৈশিষ্ট্য হলো, শক্তি প্রয়োগে কোনো রাখঢাক নেই। এই নগ্ন শক্তি প্রদর্শনের সামনে অনেক দেশ ভীত হয়ে নিজেদের অবস্থান ঠিক করছে। তবে এটা কোনো স্থিতিশীল নতুন বিশ্বব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে না। বরং এটা এক অস্থির সময়ের সূচনা।
রাশিয়া ও চীন একদিকে, আর আমেরিকার নিজস্ব অর্থনৈতিক দুর্বলতা অন্যদিকে– এই টানাপোড়েনে বিশ্বব্যবস্থা এখন এক সন্ধিক্ষণে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও জ্বালানি সম্পদের নিয়ন্ত্রণ যদি ইসরায়েল ও আমেরিকা নিতে পারে, তাহলে সাময়িকভাবে পাল্লা তাদের দিকে ঝুঁকবে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এই পথ সবার জন্যই অনিশ্চয়তা ডেকে আনবে।

বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। জ্বালানি আমদানিনির্ভর আমাদের অর্থনীতি তেলের দাম বাড়লে সরাসরি চাপে পড়বে। এর পাশাপাশি ভ্রমণ ও যোগাযোগে সাময়িক বিঘ্ন তো আছেই। কিন্তু সবচেয়ে বড় উদ্বেগ দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা নিয়ে।

ইতিহাস বলে, প্রতিটি যুদ্ধ, প্রতিটি সংকটে ভোগান্তির ভার বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকে। রাজনীতিবিদ আর সামরিক কৌশলবিদরা যে হিসাব কষেন, তার মূল্য চোকায় দেশে দেশে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ। এই অস্থির সময়ে বাংলাদেশকেও সেই অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। এটা এড়ানোর পথ খুবই সংকীর্ণ।
দেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সরকারকে এই যুদ্ধের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। এমনিতেই আমি মনে করি, নতুন সরকারের উচিত দেশের অর্থনীতি, নীতিনির্ধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে একটি বিস্তৃত জাতীয় আলোচনার আয়োজন করা। এখানে শুধু সরকারই কথা বলবে, তা নয়। ব্যক্তি খাতের কণ্ঠস্বরও থাকবে। ব্যক্তি খাত মানে কেবল কিছু করপোরেট নয়। বরং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই), অতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নাগরিক সমাজসহ প্রত্যেকের অংশগ্রহণ থাকতে হবে। তবে কণ্ঠস্বর মানে চিৎকার-চেঁচামেচি নয়, বরং বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে গঠনমূলক অংশগ্রহণ। 

সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট সফলভাবে সামাল দিয়েছে। তবে অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন তেমন একটা মূল আলোচনায় ছিল না। 
আমাদের জ্বালানি খাত এমনিতে সংকটে রয়েছে। যুদ্ধের ফলে তার অভিঘাতও সেভাবে পড়ছে। তবে যে কোনো সমস্যায় স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা নীতিনির্ধারণে বড় সমস্যা। এলএনজি আমদানি হয়েছে, অথচ সমুদ্রসীমা জয়ের পর সেখান থেকে গ্যাস উত্তোলনে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে নীতি ও রেশনিং ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তা বলা চলে মূলত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য স্বল্পমেয়াদি কৌশল। সরকারের সাশ্রয়ী নির্দেশনার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান: অর্থনীতিবিদ; এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান, পিপিআরসি

আরও পড়ুন

×