ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চারদিক

সৈকতে উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন

সৈকতে উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন
×

ইফতেখারুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৬ | ০৭:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত শুধু পর্যটনকেন্দ্র নয়; বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত হিসেবে পরিচিত এ অঞ্চল দেশের পর্যটন অর্থনীতির জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি পরিবেশগত ভারসাম্য ও নগর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৈকত এলাকায় ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র দোকানিদের উচ্ছেদ এবং তাদের পুনর্বাসন নিয়ে যে আলোচনা চলছে, সেখানে এখন পর্যন্ত কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা সামনে আসেনি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পরিষ্কার রূপরেখা না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কক্সবাজারবাসীর অভিজ্ঞতা বলছে, অতীতে সৈকত এলাকায় অস্থায়ীভাবে ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হলেও এর সঙ্গে লাইসেন্স বাণিজ্যসহ নানা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগের আমলে দলীয় নেতা ও প্রশাসনের যোগসাজশে সৈকতে এসব ঝুপড়ি গড়ে উঠেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ কথাও সত্য, ব্যবসায়ীরা জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে সৈকতে অস্থায়ী ঝুপড়িগুলো গড়ে তুলেছিলেন। সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আনার সুযোগ নেই। 

এর পার্শ্ববর্তী প্রভাবকেও আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। এসব ঝুপড়ির কারণে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট ও পরিবেশগত ক্ষতি হয়েছে এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় জনগণ চায় না, পুনর্বাসনের নামে আবারও সৈকত এলাকায় ঝুপড়ি দোকান বা অনিয়ন্ত্রিত স্থাপনা গড়ে উঠুক। আবার কেউ কেউ উদ্বেগ জানিয়েছেন, পুরোনো আমলের মতো এবারও পুনর্বাসনের নামে মূলত ব্যক্তিগত পর্যায়ে লাইসেন্স বাণিজ্য হতে পারে। একই সঙ্গে এটাও সত্য, দীর্ঘদিন ধরে জীবিকা নির্বাহ করা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সমস্যাও অস্বীকার করা যায় না। ফলে এই সংকটের সমাধানে প্রয়োজন একটি সুপরিকল্পিত, ন্যায্য এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতি।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে যুক্তিসংগত পদক্ষেপ হতে পারে সৈকত-সংলগ্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীদের সরিয়ে শহরের পার্শ্ববর্তী কোনো নির্দিষ্ট উন্মুক্ত স্থানে তাদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করা। এতে একদিকে সৈকতের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষা পাবে, অন্যদিকে ব্যবসায়ীরাও তাদের জীবিকার নিশ্চয়তা পাবেন। 

তবে পুনর্বাসন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বচ্ছতা ও সুশাসন। অতীতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পুনর্বাসনের নামে ব্যক্তি পর্যায়ে লেনদেন, দালাল চক্রের প্রভাব এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে সুবিধা বণ্টনের অভিযোগ ওঠে। এমন পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসনের উচিত একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মভিত্তিক কাঠামো তৈরি করা। উদাহরণস্বরূপ, ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের ভিত্তিতে রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যেখানে তারা ট্রেড লাইসেন্সের অধীনে ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি পাবেন। নির্দিষ্ট সময় পরপর নবায়নের মাধ্যমে তারা সরকারি তহবিলে নির্ধারিত ফি জমা দেবেন। এতে একদিকে সরকারের রাজস্ব বাড়বে, অন্যদিকে পুরো ব্যবস্থা একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে থাকবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজের মতামত অন্তর্ভুক্ত করা। কারণ কোনো পরিকল্পনা যদি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হয় না। অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে তা বাস্তবায়ন সহজ হয় এবং স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নও কমে।
সব শেষে বলা যায়, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত রক্ষা করা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি সেখানে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষের অধিকারও বিবেচনায় নিতে হবে। তাই এই সংকটের সমাধান অস্থায়ী বা তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে নয়, বরং একটি সুস্পষ্ট, স্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনার মধ্যেই নিহিত। এখন সময় এসেছে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা দ্রুত সে পরিকল্পনা জনগণের সামনে উপস্থাপন করবেন এবং একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথে এগিয়ে যাবেন। 

ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল 

আরও পড়ুন

×