সমকালীন প্রসঙ্গ
আপনার ডিগ্রি সম্পদ, নাকি বেকারত্বের সনদ?
মোর্ত্তুজা আহমেদ
প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬ | ১৫:৪৩
একটা কঠিন প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যাক। আপনি যে চার বছরের অনার্স ডিগ্রিটা অর্জন করছেন, সেটার আসল মূল্য কি দশ বছর পরেও থাকবে? নাকি প্রযুক্তির এক ঝড় এসে তাকে ধীরে ধীরে গুরুত্বহীন করে দেবে? শুনতে অস্বস্তিকর মনে হলেও, বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ বলছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বিপুল সংখ্যক হোয়াইট কলার চাকরিকে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলতে পারে। যেমন যে সকল কাজ রিপিটেটিভ, নিয়মভিত্তিক এবং সম্পূর্ণ ডিজিটাল। এই পরিবর্তনটা ধীরে ধীরে নয়, বরং হঠাৎ করেই আমাদের চোখের সামনে ঘটবে।
আমরা আজ যেসব স্কিল শেখার জন্য হাজার হাজার টাকা খরচ করছি প্রোগ্রামিং, গ্রাফিক ডিজাইন, কনটেন্ট রাইটিং এসব কি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ? এক সময় একটি ব্লগ পোস্ট লিখতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগতো, এখন কয়েক সেকেন্ডেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে। একটি লোগো ডিজাইন করতে দিনের পর দিন সময় লাগতো, এখন সেটাও মুহূর্তের মধ্যে তৈরি। ফলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা হলো যে জিনিসের প্রাচুর্য থাকে, তার মূল্য কমে যায়। অর্থনীতির ভাষায় এটাকে বলা হয় ‘স্কারসিটি ক্রিয়েটস ভ্যালু’ অভাবই মূল্য তৈরি করে। ডিজিটাল কনটেন্ট যখন পানির মতো সহজলভ্য হয়ে যাচ্ছে, তখন ‘এভারেজ’ ডিজিটাল স্কিলের বাজারমূল্য দ্রুত কমে যাওয়াই স্বাভাবিক।
এখন প্রশ্ন হলো যদি ডিজিটাল জিনিসের মূল্য কমে, তাহলে মূল্য বাড়বে কোথায়? উত্তরটা লুকিয়ে আছে ‘এনালগ প্রিমিয়াম’ এ। অর্থাৎ, যেসব কাজ প্রযুক্তি পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারে না যেখানে মানুষের স্পর্শ, অনুভূতি এবং বাস্তব উপস্থিতি অপরিহার্য। একটা উদাহরণ ভাবুন আপনি চাইলে অনলাইনে হাজার গান শুনতে পারেন। কিন্তু মানুষ কেন এখনও হাজার হাজার টাকা খরচ করে লাইভ কনসার্টে যায়? কারণ সেখানে শুধু গান নয়, আছে অভিজ্ঞতা, আছে সংযোগ, আছে বাস্তব অনুভূতি, যা কোনো এআই তৈরি করতে পারে না।
তিনটি ইন্ডাস্ট্রি, যেখানে মানুষ অপরিবর্তনীয়: ১. হিউম্যান টাচ ও কেয়ারগিভিং সেক্টর। একজন নার্স, একজন শিক্ষক, একজন কেয়ারগিভার তারা শুধু কাজ করেন না, তারা মানুষের সাথে সম্পর্ক তৈরি করেন। একটা রোবট হয়তো আপনার হার্ট সার্জারি নিখুতভাবে করতে পারবে কিন্তু সার্জারির আগে আপনার হাত ধরে আপনাকে সাহস দিতে পারবে না। একটা এআই হয়তো সেরা এডুকেশনাল ভিডিও বানাতে পারবে। কিন্তু একজন কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক যেভাবে একটা শিশুকে ইমোশনাল সাপোর্ট দিয়ে বড় করেন সেটা পারবে না। উন্নত দেশগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে এই সেক্টরের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। জাপান বা জার্মানির মতো দেশে বয়স্কদের যত্ন নেওয়ার জন্য দক্ষ মানুষের অভাব প্রকট। ফলে এই পেশাগুলোর মূল্য দিন দিন বাড়ছে।
২. হাই এন্ড ক্রাফটসম্যানশিপ। হ্যান্ডমেড বা হাতে তৈরি জিনিসের মূল্য কেন এত বেশি? কারণ সেটি ইউনিক, সেটিতে মানুষের গল্প থাকে। একটি মেশিন নিখুঁত পণ্য তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই পণ্যে কোনো ‘মানবিক গল্প’ থাকে না। একজন দক্ষ শেফ, কার্পেন্টার বা জুয়েলারি নির্মাতা শুধু পণ্য বিক্রি করেন না তারা অভিজ্ঞতা বিক্রি করেন। ভবিষ্যতে দুইটি ভাগ হবে। এক গরীব এবং মধ্যবিত্তরা ব্যবহার করবে এআই জেনারেটেড কন্টেন্ট। এআই জেনারেটেড ডিজাইন এবং রোবটের বানানো খাবার। আর দুই, ধনীরা বা এলিটরা ব্যবহার করবে মানুষের হাতে বানানো জামা, মানুষের হাতে রান্না করা খাবার এবং মানুষের আঁকা পোর্ট্রেট। ভবিষ্যতে ‘হিউমান মেড’ ট্যাগটাই হয়ে উঠবে সবচেয়ে বড় লাক্সারি।
৩. স্মার্ট এগ্রিকালচার ও ফুড সিকিউরিটি। আমরা প্রযুক্তির পেছনে ছুটতে গিয়ে একটি মৌলিক সত্য ভুলে যাচ্ছি আমরা ডেটা খেয়ে বাঁচতে পারি না। খাদ্যই আমাদের আসল প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন সংকটের কারণে বিশুদ্ধ খাবারের মূল্য দ্রুত বাড়বে। যে ব্যক্তি প্রযুক্তি ব্যবহার করে আধুনিক কৃষিকে এগিয়ে নিতে পারবে, সে ই ভবিষ্যতের প্রকৃত সম্পদশালী হবে। নেদারল্যান্ডসের উদাহরণই ধরুন ছোট একটি দেশ, কিন্তু তারা প্রযুক্তি নির্ভর কৃষির মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম বড় খাদ্য রপ্তানিকারক।
শিক্ষাব্যবস্থায় তাহলে আমরা কি ভুল পথে বিনিয়োগ করছি? এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি এই বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ? আজ বাংলাদেশে আমরা হাজার হাজার অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রিধারী তৈরি করছি, কিন্তু তাদের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থান পাচ্ছে না। কেন? কারণ আমরা ডিগ্রি তৈরি করছি, দক্ষতা না। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি বক্তব্য আলোচনায় এসেছে সবাইকে অনার্স, মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করতে হবে না। এই বক্তব্যটি শুধু একটি মতামত নয়, বরং বাস্তবতার একটি কঠিন প্রতিফলন। এখন সময় এসেছে এটিকে নীতিগতভাবে বাস্তবায়ন করার।
ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন সংখ্যা কমিয়ে কর্মমুখী শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। কারণ আমাদের শুধু অনার্স-মাস্টার্স পাস করা বেকার দরকার নেই আমাদের দরকার দক্ষ কর্মী, উদ্ভাবক, এবং উদ্যোক্তা। একজন দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান, একজন আধুনিক কৃষক, একজন ফুড উদ্যোক্তা তারা শুধু নিজের কর্মসংস্থানই তৈরি করে না, বরং অন্যদের জন্যও কাজের সুযোগ সৃষ্টি করে। অথচ আমরা এখনো এই পেশাগুলোকে সামাজিকভাবে কম মূল্য দেই।
কোথায় পার্থক্য? ধরুন, দুইজন তরুণ একজন চার বছর অনার্স এবং দুই বছর মাস্টার্স করে চাকরি খুঁজছে। অন্যজন একই সময়ে স্কিলভিত্তিক প্রশিক্ষণ নিয়ে একটি ছোট ফার্ম, রেস্টুরেন্ট বা কারিগরি ব্যবসা শুরু করেছে। পাঁচ বছর পর কে বেশি এগিয়ে থাকবে? প্রথমজন হয়তো এখনও একটি চাকরির জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। দ্বিতীয়জন হয়তো ইতোমধ্যে নিজে আয় করছে, অন্যদের চাকরি দিচ্ছে।
নীতিনির্ধারকদের প্রতি জরুরি আহ্বান, এখানে আর দেরি করার সুযোগ নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের দ্রুত, বাস্তবমুখী এবং সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদি এখনই শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন না আনা হয়, তাহলে শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে নয় রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। বিশ্ব যখন দক্ষতা, উদ্ভাবন এবং বাস্তব উৎপাদনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমরা যদি এখনও ডিগ্রি কেন্দ্রিক পুরোনো কাঠামো আঁকড়ে ধরে থাকি, তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে আর তার সাথে পিছিয়ে পড়বে পুরো দেশ। শিক্ষামন্ত্রী এবং নীতিনির্ধারকদের কাছে প্রশ্নটা তাই সরাসরি আমরা কি ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হচ্ছি, নাকি অতীতের একটি অকার্যকর মডেল ধরে বসে আছি?
শেষ কথা, ডিগ্রি না দক্ষতা কোনটা বেছে নেবেন? পৃথিবী দ্রুত বদলাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে না চললে পিছিয়ে পড়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না। তাই এখনই সময় নিজেকে প্রশ্ন করার আপনি কি শুধু একটি ডিগ্রির পেছনে ছুটছেন? নাকি এমন একটি দক্ষতা গড়ে তুলছেন, যা আপনাকে ভবিষ্যতে অপরিহার্য করে তুলবে? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে বদলাতে হবে, আমাদের চিন্তাভাবনাকে বদলাতে হবে। কারণ ভবিষ্যৎ তাদেরই যারা শুধু সার্টিফিকেট নয়, বাস্তব মূল্য তৈরি করতে পারে।
ড. মোর্ত্তুজা আহমেদ: সহযোগী অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]
- বিষয় :
- বিশ্ববিদ্যালয়
- শিক্ষা
- বেকারত্ব
- এআই
