অগ্রাধিকার
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সরকারের কাছে প্রত্যাশা
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এখন আর শুধু একটি জাতীয় ইস্যু নয়; এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র
নাজমুল আহসান
প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬ | ১৩:৫৩ | আপডেট: ৩১ মার্চ ২০২৬ | ১৪:১৩
নতুন সরকারের জলবায়ু বিষয়ক পরিকল্পনা নিয়ে পরিবেশকর্মী, গবেষক এবং জলবায়ু আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এই আগ্রহের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা—বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রা যেন পরিবেশগত টেকসইতা ও জলবায়ু ন্যায্যতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। বিশেষ করে এমন একটি সময়ে, যখন জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে, তখন সরকারের কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
সংবাদমাধ্যমে ইতোমধ্যে সরকারের কিছু প্রাথমিক পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে- বনভূমি দখলমুক্ত করা, সুন্দরবন অঞ্চলের জলজপ্রাণী সম্পদের পর্যালোচনা, প্রচলিত পদ্ধতিতে মাতুয়াইল ও আমিন বাজারের বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ ও পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। অন্যদিকে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড ও অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এক হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ ইত্যাদি। নিঃসন্দেহে সরকারের এই কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক হবে এবং জনগণ এর সফলতা ও ব্যর্থতা যাচাই করবে। তবে মূল প্রশ্ন হচ্ছে ১৮০ দিনের কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য কী আপাত সংকট মোকাবেলা, জনতুষ্টি, নাকি অন্য কিছু?
১৮০ দিনের কর্মসূচিকে আপাত সংকট মোকাবেলা ও জনতুষ্টি হিসেবে দেখা হলে তা হবে একটি সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি। বরং এই সময়কালকে দেখা উচিত একটি কৌশলগত সূচনা বিন্দু হিসেবে, যা সরকারের পুরো মেয়াদের উন্নয়ন দর্শন ও অগ্রাধিকার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই ১৮০ দিনের কর্মসূচি হতে পারে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোকে বাস্তবায়নের পথে রূপান্তরের প্রথম ধাপ এবং একই সঙ্গে বিদ্যমান উন্নয়ন কাঠামোয় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনার একটি সুযোগ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় নীতিগত অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। গত দেড় দশকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নীতি, কৌশল ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন নির্দেশনা প্রদান করছে। কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে ন্যাশনাল ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন (এনডিসি ৩.০), যা বৈশ্বিক জলবায়ু প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থানকে সুদৃঢ় করে।
এছাড়া, স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজন কার্যক্রমকে শক্তিশালী করতে সম্প্রতি প্রণয়ন করা হয়েছে ন্যাশনাল ফ্রেমওয়ার্ক অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান ফর লোকালি লেড অ্যাডাপটেশন। বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (বিসিসিএসএপি) দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও বাজেট বরাদ্দে একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। একই সঙ্গে, জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছে, জাতীয় বাজেটে জলবায়ু ব্যয়ের হিসাব নিরূপণের জন্য ক্লাইমেট বাজেট ট্র্যাকিং চালু করা হয়েছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনে নারীর ঝুঁকি মোকাবেলায় জেন্ডার অ্যাকশন প্ল্যান (সিসিগ্যাপ) প্রণয়ন—এসবই একটি সমন্বিত নীতিগত কাঠামোর অংশ।
এই সব উদ্যোগ বাংলাদেশের সক্ষমতা ও অঙ্গীকারের প্রতিফলন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই নীতিগত অগ্রগতি বাস্তব জীবনে কতটা প্রভাব ফেলছে?
বাস্তবতা হচ্ছে, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বাস্তবায়নে। বিশেষ করে ২০০৯ সালে প্রণীত বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (বিসিসিএসএপি) এখনও বাজেট ও পরিকল্পনার ক্ষেত্রে একটি মূল রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ পরবর্তী সময়ে প্রণীত নতুন নীতি, যেমন এনডিসি, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা বা অন্যান্য খাতভিত্তিক কৌশলসমূহের সঙ্গে এর সমন্বয় সাধন করা হয়নি। ফলে একটি কাঠামোগত বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে, যেখানে নীতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে ফাঁক থেকে যাচ্ছে।
এই ফাঁকের সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নারী, শিশু ও যুবসমাজের ওপর। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত—যেমন লবণাক্ততা বৃদ্ধি, বন্যা, খরা বা ঘূর্ণিঝড়—এসবের ভার সবচেয়ে বেশি বহন করছে তারাই, যাদের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ সবচেয়ে কম।
বাস্তবায়ন ঘাটতির পেছনে কয়েকটি মৌলিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, পর্যাপ্ত ও টেকসই অর্থায়নের অভাব। যদিও জলবায়ু বাজেট ট্র্যাকিং চালু আছে, তবুও বরাদ্দের পরিমাণ এবং তার কার্যকর ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক দক্ষতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি, যা প্রকল্প বাস্তবায়নের গুণগত মানকে প্রভাবিত করে। পাশাপাশি বাংলাদেশে শুধু প্রকল্প দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করা যাবে না; অধিকন্তু এগুলো হতে হবে নিয়মিত কর্মসূচির অংশ। তৃতীয়ত, এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীর অর্থবহ অংশগ্রহণের অভাব।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে যদি বিদ্যমান নীতিগুলোর সমন্বয়, হালনাগাদ এবং বাস্তবায়ন কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া যায়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে বিসিসিএসএপি-কে আধুনিকায়ন ও অন্যান্য নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা একটি জরুরি পদক্ষেপ হতে পারে।
পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এখন আর শুধু একটি জাতীয় ইস্যু নয়; এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনা ও দরকষাকষিতে সক্রিয় ও কৌশলগত অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার প্রাপ্য জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও সক্ষমতা উন্নয়ন সহায়তা নিশ্চিত করতে পারে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কার্বন ক্রেডিট ও বাজারভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়নের সুযোগ। এই খাত থেকে সুবিধা অর্জনের জন্য একটি সুসংহত নীতিমালা, দক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং স্বচ্ছ ও সহজ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। অন্যথায় সম্ভাবনাময় এই ক্ষেত্রটি অপূর্ণ থেকে যেতে পারে।
তবে এর বাইরেও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু মূল বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করা দরকার, যার মধ্যে রয়েছে অভিযোজন সম্পর্কিত উদ্যোগকে স্থানীয়করণের আমলাতান্ত্রিকসহ বিভিন্ন ধরনের বাধা দূর করা ও প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে জ্বালানি রূপান্তরে বাস্তবিক ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা। সাম্প্রতিক ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ যেন চোখে আঙুল দিয়ে আবার দেখিয়ে দিচ্ছে। আমাদের দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি বড় উপাদান হতে পারে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে ব্যাপক সৌর বিদ্যুৎ কার্যক্রম গ্রহণ করা এবং এ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা।
নাজমুল আহসান: উন্নয়নকর্মী
[email protected]
