ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ভূমধ্যসাগরই কেন তরুণের গন্তব্য হবে?

ভূমধ্যসাগরই কেন তরুণের গন্তব্য হবে?
×

উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপে পাড়ি দিতে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথ ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারাচ্ছে অনেক তরুণ

ইফতেখারুল ইসলাম 

প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪:৩৬ | আপডেট: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪:৪১

ভূমধ্যসাগরে আবারও এক বাংলাদেশি তরুণের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এবারের শিকার সুনামগঞ্জের মুহিবুর রহমান নামের এক যুবক— যার স্বপ্ন ছিল উন্নত জীবনের, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর। কিন্তু সেই স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত তাকে ঠেলে দিয়েছে মৃত্যুর মুখে। এই ঘটনা নতুন কিছু নয়; বরং এটি একটি চলমান বাস্তবতার অংশ, যেখানে উন্নত জীবনের আশায় তরুণেরা ঝুঁকিপূর্ণ পথে পাড়ি জমাচ্ছে ইউরোপের উদ্দেশ্যে। সবচেয়ে নির্মম সত্য হল, আমরা দেশে তরুণদের কর্মসংস্থান ও তাদের ভবিষ্যত গড়ে দিতে পারছি না। এই বাস্তবতায় তরুণরা ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় হয়তো মধ্যপ্রাচ্য, কিংবা ইউরোপে পাড়ি দিতে ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করছে না। 

শুধু সুনামগঞ্জের মুহিবুর রহমান নয়, এরকম শত শত তরুণ পরিবারের অবস্থা উন্নত করার লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছে। এ সমস্যা দুয়েক দিনের নয়, দীর্ঘদিন ধরে তৃতীয় বিশ্বের তরুণরা নিজেদের দেশে ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন। পত্রপত্রিকা ও বিভিন্ন সেমিনারে এ নিয়ে বহু আলাপ হলেও বাস্তবে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। ফলে একদিকে যেমন বেকারত্ম বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে হতাশা ও গ্লানি। 

প্রশ্ন হলো— কেন এই ঝুঁকি? কেন একজন তরুণ নিজের জীবনকে এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলতে বাধ্য হয়? এর উত্তরে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব এবং মানসম্মত শিক্ষার ঘাটতি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে সনদনির্ভর, দক্ষতানির্ভর নয়। ফলে হাজার হাজার তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ থেকে পাস করে বের হলেও চাকরির বাজারে নিজেদের উপযুক্তভাবে উপস্থাপন করতে পারে না। অন্যদিকে, দেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও সীমিত। অশিক্ষিত তরুণদের জন্যও সরকারি উল্লেখযোগ্য কোনো পরিকল্পনা নেই। সম্প্রতি কেউ কেউ রিকশা কিংবা অটোরিকশা চালিয়ে পরিবারের জন্য জীবিকানির্বাহ করছেন। 

মূলত দেশে সরকারি চাকরি অপ্রতুল এবং বেসরকারি খাতে রয়েছে নানা অনিশ্চয়তা। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা অভিজ্ঞতার অযৌক্তিক চাহিদা তরুণদের হতাশ করে তোলে। ফলে তারা মনে করে, দেশে থেকে তাদের ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে অসংখ্য তরুণ বিদেশে পড়তে যাচ্ছে। মূলত এর পেছনে দেশের অনিশ্চিত ভবিষ্যতই দায়ী। এই হতাশা থেকে তরুণদের কেউ কেউ অবৈধ পথে বিদেশমুখী হয়ে পড়ছে। 

মানবপাচারকারী চক্রগুলো মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তরুণদের স্বপ্ন দেখায়, কিন্তু বাস্তবে তাদেরকে ঠেলে দেয় মৃত্যুঝুঁকিতে। ছোট নৌকায় করে উত্তাল সাগর পাড়ি দেওয়া, খাবার ও পানির অভাব, এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঝুঁকি। সব মিলিয়ে এটি এক ধরনের আত্মঘাতী অভিযান। তবুও তরুণেরা যাচ্ছে, কারণ তাদের কাছে এটি যেন শেষ আশ্রয়।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করতে হবে। দক্ষতাভিত্তিক ও কর্মমুখী শিক্ষা চালু করতে হবে, যাতে তরুণেরা বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্য জ্ঞান অর্জন করতে পারে। দ্বিতীয়ত, দেশে বিনিয়োগ বাড়িয়ে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, শিল্প ও উদ্যোক্তা খাতে তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কেবল সনদনির্ভর উচ্চশিক্ষা আমাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তৃতীয়ত, মানবপাচার রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। গ্রামের সাধারণ মানুষকে জানাতে হবে এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার বাস্তবতা। একইসঙ্গে বৈধ পথে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ, যাতে তরুণেরা নিরাপদে বিদেশে যেতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, ভূমধ্যসাগরে এই তরুণের মৃত্যু কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। যদি আমরা সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ না নিই, তাহলে এই মৃত্যুর মিছিল থামবে না। তরুণদের স্বপ্নকে নিরাপদ ও বাস্তবমুখী করার দায়িত্ব আমাদের সবার— রাষ্ট্র, সমাজ এবং নীতিনির্ধারকদের। 

ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল 
 

আরও পড়ুন

×