ভর্তি পদ্ধতি
লটারির পরিবর্তে ভর্তি পরীক্ষা শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বাড়াবে
লটারির পরিবর্তে আবারও পরীক্ষা পদ্ধতি চালু হলে প্রাইভেটের প্রবণতা বাড়বে
পলাশ কান্তি নাগ
প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ | ১৫:৩১ | আপডেট: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ | ১৬:২০
মানব পরিচয়ের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য শিক্ষা। শিক্ষার অধিকার সার্বজনীন। কিন্তু বিদ্যমান বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থায় সকল নাগরিকের সন্তানদের শিক্ষার পথ অবারিত করার পরিবর্তে ক্রমাগত সংকুচিত করা হয়েছে। নানাভাবে শিক্ষার বেসরকারীকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণের ধারাকে উৎসাহিত করা হয়েছে।
সম্প্রতি বিদ্যালয়ে ভর্তিতে লটারির পরিবর্তে প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষার বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণা শিক্ষাকে বাজারমুখী করে তোলার নামান্তর। অত্যন্ত তড়িঘড়ি ও অপরিকল্পিতভাবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এমন একটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে পর্যাপ্ত গবেষণা, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং অংশীজনদের সাথে বিস্তৃত আলোচনার প্রয়োজন ছিলো।
লটারির পরিবর্তে আবারও পরীক্ষা পদ্ধতি চালু হলে শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ বাড়বে এবং কোচিং-প্রাইভেটের প্রবণতা নতুন করে মাথাচাড়া দেবে।
৪-৬ বছরের শিশুকে মেধা যাচাইয়ের নামে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামানো অবিচার ও অমানবিক। এই বয়সে একজন শিশু সবেমাত্র কথাবার্তা ও যোগাযোগ করতে শেখে। প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ, পরিবার ও সমাজকে জানতে শুরু করে। মেধা যাচাইয়ের পরীক্ষায় ছিটকে পড়লে
জীবনের শুরুতেই তুমি অযোগ্য, তুমি ব্যর্থ এই গ্লানি নিয়ে শিশুটি বেড়ে উঠবে। একজন শিক্ষার্থী যখন পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয় তখন ব্যর্থতার জন্য শুধু তাকেই দায়ী করা হয়। বাস্তবিক অর্থে এই দায় শিক্ষক, শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষার কারিকুলাম তথা সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার।
পৃথিবীতে কেউ মেধাহীন হয়ে জন্মায় না। তাছাড়া মেধাবীদের বেছে নেওয়া একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। বরং মেধার বিকাশ ঘটানোই মুল লক্ষ্য হওয়া উচিৎ। শিশু বয়সে শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাই করা শিক্ষা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোন থেকেও যৌক্তিক নয়।
ভর্তি পরীক্ষা চালু হলে নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুরা কাঠামোগতভাবেই পিছিয়ে পড়বে। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন কোচিং ব্যবসার সুযোগ থাকবে না। এটি ফাঁকা আশ্বাস। প্রাইভেট-কোচিং এর দৌরাত্মে অভিভাবকের আর্থিক সক্ষমতার উপর শিক্ষার্থী কতটা মেধাবী সেটা নির্ধারিত হবে। সম্পদ ও সুযোগের মাধ্যমে উচ্চ বিত্তরা দামী স্কুলে পড়বে। শিশুদের শৈশব কেড়ে তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হবে মুখস্থ বিদ্যার গাইড। সারা দুনিয়া আনন্দময় শিক্ষার দিকে ঝুঁকছে। বিশ্বের কোথাও শিশুদের ভর্তির ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থার প্রচলন নেই। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারত ও শ্রীলংকাতেও না। সেখানে ভর্তি পরীক্ষা বা লটারি কোনটাই নেই। জাপানের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রথম চার বছর শিক্ষার্থীদের কোনো পরীক্ষাই দিতে হয় না।
ভালো ও মানসম্মত পর্যাপ্ত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অপ্রতুলতা দুর করতে পারলে লটারি কিংবা ভর্তি পরীক্ষার বিতর্কে আমাদের আটকে থাকতে হতো না। যে এলাকার শিক্ষার্থী সেখানেই ভর্তি হবে। পৃথিবীর বহু দেশে জোনিং বা ম্যাপিং স্কুল সিস্টেম চালু রয়েছে। আমাদের দেশেও সেই পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিৎ। তাহলে অভিভাবকদের শিক্ষার্থীদের নিয়ে দৌড়ঝাঁপ, দুশ্চিন্তা, রাস্তা-ঘাটে জ্যাম,যানবাহনের সমস্যা এসব থাকবে না। একা কিংবা অভিভাবকদের সাথে পাঁয়ে হেঁটে অথবা সাইকেলে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে পারবে।
ভর্তি পরীক্ষা ঘিরে অনিয়ম-দুর্নীতি-তদবির পূণরায় ফিরে আসার আশংকা রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশুদের ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতি তুলনামূলক ভালো। এক্ষেত্রে লটারি যেনো স্বচ্ছ হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
তবে লটারি কোনো আদর্শ সমাধান নয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও আমরা ঠিক করতে পারিনি বিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া কি হবে? সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদে আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সব শিশুকে বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের নিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে। অথচ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চরম দারিদ্র্যতা, শিশু শ্রম ও দূরবর্তী স্কুলসহ নানাবিধ কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ১৬.২৪ শতাংশ। প্রায় ৬৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় অর্ধে শিক্ষক পদ শুন্য।
বাজেটে সামরিকসহ অনুৎপাদনশীল খাতে প্রতি বছর বাজেটে ব্যয় বরাদ্দ বাড়লেও শিক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়ছে না। অথচ ইউনেস্কো শিক্ষাখাতে জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দের সুপারিশ করলেও কোনো সরকারের বাজেটে তার প্রতিফলন ঘটেনি। অন্যদিকে বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত শিক্ষা পদ্ধতি জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার পথে অন্তরায়। সরকার শিক্ষার আর্থিক দায়িত্বকে পাশ কাটিয়ে বাণিজ্যিকীকরণের পথে হাঁটছে সাম্প্রতিক পদক্ষেপ সেটি ইঙ্গিত করে।
পলাশ কান্তি নাগ: আইনজীবী ও অ্যাকটিভিস্ট
[email protected]
- বিষয় :
- লটারি
- বিদ্যালয়ে ভর্তি
- ভর্তি পরীক্ষা
