আমরা কি দিন দিন অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছি?
রাষ্ট্র নাগরিকদের, এমনকি মৃতদেরও সুরক্ষা দিতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে
মো. আবু নাসের
প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১৯:০৮
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে শনিবার সুফিবাদী পীর শামীম জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরীকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এটি এমন একটি সমাজের চিত্র যা ক্রমশঃ অসহিষ্ণুতার ইঙ্গিতবহ। এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও নৈতিক ব্যর্থতার সর্বসাম্প্রতিক বহিঃপ্রকাশ। আমরা এমন এক সমাজ তৈরি করছি যেখানে মব সন্ত্রাসকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাষ্ট্র নাগরিকদের, এমনকি মৃতদেরও সুরক্ষা দিতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। এই ধরণের সহিংসতা বহুত্ববাদ, মানবিক মর্যাদা এবং আইনের শাসনের মতো বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতির একেবারে মূলে আঘাত হানে।
শামীম জাহাঙ্গীর অনেক মানুষের কাছে আধ্যাত্মিক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এমন একজন ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা কেবল একটি বর্বর কাজই নয়, বরং এটি বাংলাদেশে বহু শতাব্দী ধরে চলে আসা ধর্মীয় সহাবস্থানের ঐতিহ্যের ওপর একটি আঘাত। পীরদের সাথে যুক্ত বিশ্বাস বা রীতিনীতির সাথে কেউ একমত হোন বা না হোন, সেটি এখানে মূল বিবেচ্য বিষয় নয়। ব্যক্তিগত বিশ্বাস যেমনই হোক না কেন, একটি সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্রে ধর্মীয় নেতা হিসেবে তাঁর মর্যাদাই তাঁকে উন্মত্ত জনতার সহিংসতা থেকে সুরক্ষিত রাখার কথা।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি। গত বেশ কয়েক বছরে বাংলাদেশে একের পর এক এরকম গুজব কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। এই নৃশংস ঘটনার চেয়েও বেশি উদ্বেগজনক হল এর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের সেই অতিপরিচিত ধারা। নিন্দা বা প্রতিবাদ, যদি তা আসেও, তবে তা প্রায়শই হয় কেবলই লোক দেখানো বা দায়সারা গোছের। তদন্ত প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে থাকে। অপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়ে ওঠে অধরা। সব সরকারের শাসনামলেই এই চক্রটির বারবার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এর ফলে নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্রের সদিচ্ছা বা সক্ষমতার প্রতি জনগণের আস্থা ক্রমশ ক্ষয়ে যাচ্ছে।
পাঠকের নিশ্চয়ই মনে আছে ২০২৫ সালে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ-কাণ্ড। সাম্প্রতিক স্মৃতির মধ্যে অন্যতম মর্মান্তিক ঘটনা ছিল এটি। একদল উন্মত্ত জনতা একজন পীরের মাজারে হামলা চালিয়ে তাঁর মরদেহ কবর থেকে তুলে এনে জনসমক্ষে পুড়িয়ে ফেলে। গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে অসংখ্য মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই হামলার ধরণ ছিল বিস্ময়করভাবে একই রকম।
এরকম হামলা যে কেবল পুলিশি সক্ষমতার অভাবে ঘটছে তা নয়। এখানে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বিষয়টিও জড়িত। অনেক ক্ষেত্রেই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার অনেক আগেই কিছু সতর্কসংকেত দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় অত্যন্ত ধীরগতিতে, অথবা অতিমাত্রায় সতর্কতার সাথে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন শেষমেশ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, ততক্ষণে মূল ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়নি।
সমানভাবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো মব সহিংসতা ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে ওঠা। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ হোক, চুরির ঘটনা হোক কিংবা নৈতিক স্খলনের বিষয় হোক, যখন উন্মত্ত জনতা অপরাধ ও শাস্তির নির্ধারক হিসেবে কাজ করতে শুরু করে তখন বৈধ শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। এই ক্ষয় কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। বরং, এটি একটি ক্রমপুঞ্জিত প্রক্রিয়া। প্রতিটি শাস্তিহীন কিংবা অপর্যাপ্তভাবে প্রতিরোধকৃত ঘটনা পরবর্তী ঘটনার পথকে আরও সুগম করে তোলে।
এরকম মর্মান্তিক ঘটনার পর সরকার সাধারণত খুব বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে থাকে। দ্রুত বিচার ও কঠোর পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দেয়। অথচ, ঘটনার পুনরাবৃত্তিই প্রমাণ করে যে, গৃহীত ব্যবস্থা ছিল অপর্যাপ্ত। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং বছরের পর বছর ধরে যখন একই ধরনের সহিংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে, তখন রাষ্ট্র আর বিশ্বাসযোগ্যভাবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের দাবি করতে পারে না।
গণ-সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য কেবল ঘটনার পর অপরাধীদের গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত হস্তক্ষেপ করা। স্থানীয় পর্যায়ে ব্যর্থতার জন্য জবাবদিহিতা চালু করতে হবে। সর্বোপরি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু করতে হবে, যা যেকোনো ধরনের উস্কানিকে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দিতে নারাজ। এর পাশাপাশি প্রয়োজন একটি দ্ব্যর্থহীন জনবার্তা: ধর্মীয়, নৈতিক কিংবা ফৌজদারি, যেকোনো ধরনের অভিযোগই হোক না কেন, তা কোনোভাবেই বিচারবহির্ভূত শাস্তিকে বৈধতা দিতে পারে না।
বাংলাদেশের সব সরকারই প্রায়শই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিয়ে গর্ব করে থাকে। অথচ উন্নয়নকে কেবল জিডিপির পরিসংখ্যান কিংবা মেগাপ্রকল্পের মাধ্যমেই পরিমাপ করা যায় না। একটি জাতির প্রকৃত অগ্রগতি প্রতিফলিত হয় সে দেশের নাগরিকরা কতটা নিরাপদে বসবাস করতে পারে, নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারে এবং নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতিনীতি পালন করতে পারে এরকম কয়েকটি বিষয়ের উপর। এই মানদণ্ডে, বাংলাদেশ বর্তমানে এক উদ্বেগজনক পশ্চাৎপদতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসের মূল ভিত্তিও প্রোথিত রয়েছে মর্যাদা, ভাষা এবং ন্যায়বিচারের সংগ্রামের গভীরে। সেই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের সাথে বর্তমান পরিস্থিতি মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই অসংগতিকে এখন উপেক্ষা করা যাবে না। তাই পীর সাহেবকে হত্যার ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে এটিকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে অনুধাবন করতে হবে। যখন সহিংসতা একটি পূর্বানুমেয় বা স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়, তখন সেই ব্যর্থতা আর কোনো আকস্মিক বা অনিচ্ছাকৃত বিষয় থাকে না। বরং তা একটি কাঠামোগত ব্যর্থতায় রূপ নেয়। আর যখন রাষ্ট্র বারবার ঘটনার অনেক পরে এসে উপস্থিত হয়, তখন সে কেবল প্রশাসনিক কর্তৃত্বই হারায় না, নৈতিক বৈধতাটুকুও হারিয়ে ফেলে।
ড. মো. আবু নাসের: যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি বেকার্সফিল্ডের কমিউনিকেশনস বিভাগের চেয়ারপারসন
