ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

পেট্রোল পাম্পে জীবনের গতি

পেট্রোল পাম্পে জীবনের গতি
×

ইফতেখারুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি করেছে, তার সরাসরি প্রভাব এখন বাংলাদেশের জনজীবনে দৃশ্যমান। গত কয়েক দিন রাত ১২টার পর ঢাকার কয়েকটি পাম্প এলাকায় যে দৃশ্য চোখে পড়েছে, তা অবিশ্বাস্য। শত শত যানবাহন অচল হয়ে পড়ে আছে। অন্যদিকে রাস্তা সরু হয়ে পড়ায় অন্যান্য যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। রাজধানী ঢাকার পেট্রোল পাম্পগুলোতে দিনরাত মোটরসাইকেল ও গাড়ির দীর্ঘ সারি যেন এক নতুন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই দীর্ঘ সারি কেবল জ্বালানি সংকটের চিত্রই তুলে ধরছে না; এটি নগর ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাকেও স্পষ্ট করছে। পাম্পের সামনে অপেক্ষমাণ যানবাহন মূল সড়কে ছড়িয়ে পড়ায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে, যা কর্মব্যস্ত নগরীর স্বাভাবিক গতি থামিয়ে দিচ্ছে। কয়েক লিটার তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে পেশাজীবীদের। ফলে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, উৎপাদনশীলতা কমছে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

এ সংকট শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নেই; দেশের মহাসড়কগুলোতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। পরিবহন খাতে জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ায় পণ্য পরিবহনে বিলম্ব হচ্ছে, যা সরাসরি বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ঝুঁকি তৈরি করছে। কৃষি, শিল্প এবং সেবা খাত–সব ক্ষেত্রেই এর বহুমাত্রিক প্রভাব পড়ছে। একদিকে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, ফলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে বা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলেই দেশের অভ্যন্তরে সংকট দেখা দেয়, বর্তমান পরিস্থিতি তারই প্রকট উদাহরণ। কিন্তু এটাও বাস্তবতা যে দেশের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এ ধরনের সুযোগ পেলে পণ্য মজুত রেখে দাম কয়েক গুণ করে ফেলে। সংকট মুহূর্তকে তারা মুনাফা লাভের সবচেয়ে ভালো সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে। 
এ পরিস্থিতি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরছে, আমরা কি এখনও এককভাবে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারব? বাস্তবতা হলো, বৈশ্বিক অস্থিরতা যত বাড়বে ততই এই নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। তাই এখনই বিকল্প জ্বালানি উৎসের দিকে গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, যেমন–সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ব্যবহারের প্রসার ঘটানো জরুরি। পাশাপাশি জ্বালানি সংরক্ষণ ও দক্ষ ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলাও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

সরকারি পর্যায়ে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমন–জ্বালানি সরবরাহের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা, পেট্রোল পাম্পে ডিজিটাল কিউ ব্যবস্থাপনা চালু করা এবং অপ্রয়োজনীয় যান চলাচল নিরুৎসাহিত করা। একই সঙ্গে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য করে তুললে ব্যক্তিগত যানবাহনের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
ইতোমধ্যে ঢাকা শহর যেভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, তাতে নিকট ভবিষ্যতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব বলে মনে হয় না। তবে সরকারি পরিবহনগুলো আরও কার্যকরী করা, উপশহরগুলোকে ধীরে ধীরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক দিক থেকে শক্তিশালী করে ঢাকার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনলে কিছুটা সুবিধা পাওয়া যাবে।

বাসাবাড়ি ও সরকারি অফিস-আদালতে জ্বালানি শক্তির ব্যবহারে আমরা আরও সচেতন হতে পারি। এ বিষয়গুলো যতটা চারপাশ থেকে শেখা যায়, তার চেয়ে পরিবারের চর্চার অভ্যেসটা শিশুদের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অভিভাবকদের মাঝে এই বোধোদয় জাগিয়ে তোলাও জরুরি। 
সব শেষে বলা যায়, বর্তমান জ্বালানি সংকট শুধু একটি সাময়িক সমস্যা নয়; এটি আমাদের জ্বালানিনীতির দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা সামনে এনে দিয়েছে। এই সংকটকে যদি আমরা একটি সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করতে পারি, তবে ভবিষ্যতের জন্য একটি টেকসই, নিরাপদ এবং স্বনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। অন্যথায় এ ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসবে এবং প্রতিবারই আমাদের জনজীবন ও অর্থনীতিকে আরও বেশি বিপর্যস্ত করে তুলবে।

ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×