ধরিত্রী দিবস
জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর তামাকের কালো থাবা
তামাকের ধোঁয়ামুক্ত নির্মল বাতাস সবুজ ও সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলতে পারে
আলমগীর কবির
প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪:০৯
প্রতি বছর ২২ এপ্রিল ‘ধরিত্রী দিবস’ পালিত হয়। এই দিনটি মনে করিয়ে দেয় যে, এই গ্রহ এবং এর অধিবাসীদের সুরক্ষায় সম্মিলিত দায়বদ্ধতার কথা। পৃথিবী আজ নানা সংকটে জর্জরিত। জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে দূষণ-সবকিছুর পেছনেই মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড দায়ী। তবে ধরিত্রীকে বিষিয়ে তোলার পেছনে যে পণ্যটি নীরবে সাংঘাতিক ভূমিকা রাখছে তা হল তামাক। তামাক কেবল মানুষের স্বাস্থ্যকে তিলে তিলে ধ্বংস করছে না, বরং এটি মাটি, পানি এবং বায়ুর ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের নবম বৃহত্তম তামাক ব্যবহারকারী দেশ। দেশের ১৫ বছর ও তদুর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর ১৮ শতাংশ মানুষ ধূমপানে অভ্যস্ত। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য ঝুঁকির প্রতিফলন। বাংলাদেশে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের কারণে প্রায় ২ লক্ষ মানুষ অকালে মারা যান (টোব্যাকো এটলাস, ২০২৪)।
তামাক উৎপাদন একটি দীর্ঘ ও ক্ষতিকর প্রক্রিয়া। চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন এবং ব্যবহার— সব ধাপেই পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তামাক চাষের জন্য ব্যাপক হারে বন উজাড় হয়। এক একর জমিতে যে পরিমাণ তামাক উৎপন্ন হয় তা শুকানোর জন্য ৫ টন কাঠের প্রয়োজন। ফলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ে। একইসঙ্গে তামাক চাষে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক মাটি ও পানিকে দূষিত করে, যা কৃষি ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
ধূমপানের ফলে ধোঁয়া বাতাসে মিশে যায়, ফলে বায়ু দূষণ ঘটে। এতে অধূমপায়ীরাও পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়। সোসাইটি ফর রিসার্চ অন নিকোটিন অ্যান্ড টোব্যাকোর তথ্য অনুযায়ী, পরোক্ষ ধূমপানের কারণে ঢাকার প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ৯২ শতাংশ শিশুর শরীরে উচ্চমাত্রার নিকোটিন পাওয়া গেছে।
তামাকজাত পণ্যের বর্জ্যও পরিবেশের জন্য একটি বড় হুমকি। সিগারেটের অবশিষ্টাংশে থাকা প্লাস্টিক ফিল্টার বা বাট এবং প্যাকেট মাটি ও পানিতে মিশে পরিবেশ দূষণ করে। বাংলাদেশে প্রতি বছর বিড়ি সিগারেটের বিষাক্ত বর্জ্য হিসেবে ৪০ হাজার ৪৯০ টন বাট ও প্যাকেট মাটিতে মিশে মাটি ও পরিবেশ দূষণ করছে। আর সেগুলো নদী-নালা ও সমুদ্রে গিয়ে জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হচ্ছে (টোব্যাকো এটলাস)। ফলে তামাক একটি ‘ডাবল থ্রেট’। এটি প্রাণী ও পরিবেশ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।
সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে তামাকজনিত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। অথচ একই অর্থবছরে তামাক খাত থেকে সরকারের মোট রাজস্ব আয় ছিল মাত্র ৪১ হাজার কোটি টাকা (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়, ২০২৫)। মূলত তামাক থেকে যে রাজস্ব আসে, তার দ্বিগুণেরও বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা, কর্মক্ষমতা হ্রাস, অকালমৃত্যুজনিত আর্থিক ক্ষতি এবং পরিবেশগত ক্ষতি মোকাবিলায়।
বাংলাদেশে বর্তমান তামাক করব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল এবং তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের মাসিক গড় আয় ১০৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৯৩ শতাংশ এবং মুদ্রাস্ফীতি ১০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। অথচ এই সময়ে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেটের দাম বেড়েছে মাত্র ২০-৩০ শতাংশ, যেখানে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে ৫০-৯০ শতাংশ। ফলে তামাকজাত পণ্য সাধারণ মানুষের কাছে সাশ্রয়ী হয়ে উঠেছে, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য চরম হুমকি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ন্যাশনাল ক্যান্সার ইন্সটিটিউড এর গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নয়নশীল দেশ গুলোতে গড়ে ১০% মূল্য বৃদ্ধি করলে তামাক ব্যবহার ৪–৫% পর্যন্ত কমে যায়। তাই আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রস্তাবিত তামাক কর অনুযায়ী নিম্ন ও মধ্যম স্তরকে একীভূত করে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ করা; উচ্চস্তরে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ১৫০ টাকা নির্ধারণ করা এবং প্রিমিয়াম স্তরে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ২০০ টাকা নির্ধারণ করা যেতে পারে। সব স্তরে প্রতি প্যাকেটে সমানভাবে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট (স্পেসিফিক) কর আরোপ করা এবং ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্যের (জর্দা, গুল) ওপরও কর ও মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা হলে তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার কমানো সম্ভব হবে, যা পরিবেশ রক্ষায়ও ভূমিকা পালন করবে।
এই প্রস্তাবনা বাস্তবায়িত হলে ৫ লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত হবে এবং প্রায় ৪ লাখ তরুণকে ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত রাখা সম্ভব হবে। এই সংস্কারের মাধ্যমে সরকার প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব অর্জন করতে পারবে। যা গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব প্রদান করবে।
বর্তমানে নতুন সরকারের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হল রাজস্ব ঘাটতি কমানো। তামাকে কার্যকর কর বৃদ্ধির মাধ্যমে এই রাজস্ব ঘাটতি কমানো সম্ভব। এটি সাধারণ মানুষের পকেট থেকে হওয়া স্বাস্থ্য ব্যয় কমাতেও সাহায্য করবে। আর পরিবেশের উপর অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ কমাতে সাহায্য করবে। এই তামাক কর কাঠামো সংস্কার একই সাথে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব বৃদ্ধিতে ‘ডাবল ডিভিডেন্ড’ বা দ্বিমুখী সুবিধা প্রদান করবে।
ধরিত্রী দিবসে এবছরের প্রতিপাদ্য হলো ‘আমাদের শক্তি, আমাদের পৃথিবী।’ একটি সুস্থ পৃথিবীর পূর্বশর্ত হল সুস্থ মানুষ। কিন্তু বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর তামাকের যে কালো থাবা, তা দেশের পরিবেশ প্রতিনিয়ত বিষিয়ে তুলছে। এই প্রেক্ষাপটে পরিবেশ ও তরুণ প্রজন্মকে তামাকের ছোবল থেকে বাঁচাতে এবং একটি সুস্থ সবল জাতি গঠনে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই কর সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। তামাকের ধোঁয়ামুক্ত নির্মল বাতাস আর সুস্থ নাগরিকই পারে একটি সবুজ ও সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলতে।
আলমগীর কবির: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)
