ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চারদিক

নগর নিষ্কাশনে অবহেলা কেন

নগর নিষ্কাশনে অবহেলা কেন
×

মেশকাতুন নাহার 

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৯ | আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

শহর মানেই কংক্রিটের জঙ্গল, পরিকল্পিত রাস্তা, আধুনিক অবকাঠামো–এমন ধারণা বহুদিনের। বাস্তবে বাংলাদেশের অধিকাংশ শহরের চিত্র ভিন্ন। বর্ষা এলেই অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা, রাস্তায় হাঁটুসমান পানি, নোংরা নালা বা ড্রেনের উপচে পড়া দুর্গন্ধ–এসব যেন নগরজীবনের অনিবার্য অংশ হয়ে উঠেছে। অথচ এই সমস্যার সমাধান কোনো দুরূহ বিষয় নয়; প্রয়োজন কেবল সঠিক পরিকল্পনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং দায়বদ্ধতা।

নালা বা নর্দমা খনন একটি চলমান প্রক্রিয়া হলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, নতুন নালা নির্মাণ করা হলেও পুরোনোগুলো অপরিষ্কার থেকে যাচ্ছে। কোথাও আবার খননের নামে খোঁড়াখুঁড়ি করে রেখে দেওয়া হয়, যা দীর্ঘদিন ধরে জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও সঠিক সংযোগ না থাকায় পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ থাকে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জল জমে যায় এবং শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।

বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমের আগে ড্রেন পরিষ্কার না করা একটি বড় অবহেলা। এই সময়ে যদি পরিকল্পিতভাবে ড্রেনগুলো পরিষ্কার করা হয়, আবর্জনা অপসারণ করা হয় এবং পানিপ্রবাহের পথ সুগম করা হয়, তাহলে জলাবদ্ধতার সমস্যা অনেকাংশে কমে আসতে পারে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বর্ষা শুরু হওয়ার পর হঠাৎ করেই তড়িঘড়ি কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়।
নগরবাসীর ভোগান্তির আরেকটি বড় কারণ হলো ড্রেনে আবর্জনা ফেলা। সচেতনতার অভাব এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে ড্রেনগুলো দ্রুত ভরে যায়। প্লাস্টিক, পলিথিন, গৃহস্থালি বর্জ্য–সবকিছুই গিয়ে জমা হয় এই ড্রেনগুলোতে। ফলে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। 

দায়িত্বের প্রশ্নে সবচেয়ে বড় অংশটি বর্তায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সিটি করপোরেশনের ওপর। নগর ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্ব তাদের হাতেই ন্যস্ত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় স্থান পায় না। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ হলেও নালা পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের মতো মৌলিক বিষয়গুলো উপেক্ষিত থেকে যায়। ফলে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছায় না।

নালা খনন ও রক্ষণাবেক্ষণে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগও নতুন নয়। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, পরিকল্পনাহীন কাজ এবং তদারকির অভাব–এসব কারণে অনেক নালা অল্প সময়ের মধ্যেই অকেজো হয়ে পড়ে। ফলে একই কাজ বারবার করতে হয়, যা একদিকে অর্থের অপচয়, অন্যদিকে জনগণের জন্য দুর্ভোগের কারণ।
প্রথমত, সমাধানের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন একটি সমন্বিত নগর ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান। শহরের প্রতিটি এলাকার জন্য আলাদা করে পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে, যেখানে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য কার্যকর পথ নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বর্ষা মৌসুমের আগে বাধ্যতামূলকভাবে নালা পরিষ্কারের একটি জাতীয় নির্দেশনা থাকা উচিত। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সব নালা পরিষ্কার এবং এর অগ্রগতি জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে। এতে একদিকে স্বচ্ছতা বাড়বে, অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।

তৃতীয়ত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা অত্যন্ত জরুরি। ঘরে ঘরে বর্জ্য সংগ্রহের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে মানুষ নালাতেই আবর্জনা ফেলবে–এটিই স্বাভাবিক। তাই আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এবং নাগরিকদের সচেতন করা–দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সব শেষে বলা যায়, নালা বা নর্দমা পরিষ্কার ব্যবস্থার মতো মৌলিক বিষয়গুলো অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। নগরজীবনের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে হলে এই খাতটিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় উন্নয়নের বড় বড় গল্পের আড়ালে লুকিয়ে থাকবে নাগরিক জীবনের নিত্যদিনের দুর্ভোগ।

মেশকাতুন নাহার : প্রভাষক সমাজকর্ম, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর
 

আরও পড়ুন

×