সমকালীন প্রসঙ্গ
ঢাকার খাল : সমস্যার গোড়ায় হাত দিন
ঢাকার অধিকাংশ খাল এখন কার্যত খোলা নর্দমায় পরিণত হয়েছে
মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ | ১৫:৫২ | আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ | ১৬:০০
সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেখা গেছে যে, রাজধানী ঢাকার দখল ও দূষণে বিপর্যস্ত খালগুলো পুনরুদ্ধারে বর্তমান সরকার নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। চলতি বছরে ১৯টি খালের প্রায় ১২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ জলপ্রবাহ নেটওয়ার্ক আবার সচল করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ভালো। কেননা ঢাকা একসময় ছিল খালনির্ভর শহর। নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহই এই শহরের প্রাণ ছিল। কিন্তু আজ সেই খালগুলোই পরিণত হয়েছে দখলদারিত্ব, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার শিকার এক মৃতপ্রায় অবকাঠামোতে।
এক সময় ঢাকার খালব্যবস্থা ৩৪০–৩৪৪ কিলোমিটার বিস্তৃত ছিল, যা এখন ২২০ কিলোমিটারের কাছাকাছি নেমে এসেছে। সিএস খতিয়ান অনুযায়ী, খালগুলোর জায়গা দখল করে কোথাও বহুতল ভবন, কোথাও বাজার কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এমনকি বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা নির্মিত হওয়ায় প্রায় ১২৪ কিলোমিটার বিলুপ্ত হয়েছে, যার পরিমাণ ৬৩.৯৩ শতাংশ। বর্তমান অবশিষ্ট অংশের বড় অংশই সংকুচিত ও দূষিত। খালের সংখ্যা ৪৭–৬৫ থেকে কমে ২৬–৩০-এ দাঁড়িয়েছে। এই ২৬টির পুরোটা প্রবহমান নেই। ১৩টি খালের প্রস্থ ১০ ফুটের বেশি নয়। এর মধ্যে বড় অংশই দখল, ভরাট ও দূষণের কারণে কার্যকারিতা হারিয়েছে।
ঢাকা ওয়াসা এবং দুই সিটি করপোরেশনের সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, রাজধানীর খালগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ৬০–৭০ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে দখল বা অবৈধ স্থাপনার আওতায় রয়েছে। ফলস্বরূপ এখানকার প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের বহু এলাকায় পানি জমে স্থায়ী জলাবদ্ধতার রূপ নিচ্ছে। নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সুপরিকল্পিত ও বাসযোগ্য শহরের জন্য মোট এলাকার অন্তত ১৫ শতাংশ জলাভূমি থাকা অপরিহার্য। যদিও ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যানে ঢাকার ক্ষেত্রে প্রায় ১২ শতাংশ জলাভূমির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, বাস্তবে অবৈধ দখল ও নির্বিচার ভরাটের ফলে তা কমে ৫ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। এগুলো নগর পরিবেশ, টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ ও প্রতিবেশগত সংকট, জনস্বাস্থ্য, নগর পরিকল্পনা ও অর্থনীতিরও গভীর ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি এবং একটি গুরুতর সতর্কবার্তা।
ঢাকার জলাবদ্ধতার কারণ মূলত খাল বিলীন হয়ে যাওয়া। ঢাকার বর্ষাকাল এখন আর স্বস্তির নয়, বরং আতঙ্কের নাম। অল্প বৃষ্টিতেই শহরের বড় বড় সড়ক ডুবে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, যা খালগুলোর ধ্বংসের কারণ। একসময় খালগুলো বৃষ্টির পানি দ্রুত নদীতে নিষ্কাশন করত। এখন সেই পথ বন্ধ। ফলে পানি জমে থাকে সড়ক, বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক এলাকায়। এতে শুধু জনদুর্ভোগই বাড়ে না, বরং অর্থনৈতিক ক্ষতিও হয় ব্যাপকভাবে।
ঢাকার অধিকাংশ খাল এখন কার্যত খোলা নর্দমায় পরিণত হয়েছে। খাল দূষণ ও ভরাটের সবচেয়ে বড় উৎসগুলোর একটি হল বাসা-বাড়ির আবর্জনা, শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক বর্জ্য, ও টেক্সটাইল ডায়িং কারখানার বর্জ্য। পানির প্রবাহ বন্ধ হওয়ায় সেগুলোতে পচন সৃষ্টি হচ্ছে, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। বাস্তবতা হলো— ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভারের শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত হাজার হাজার কারখানার একটি বড় অংশ এখনও সম্পূর্ণ কার্যকর ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) ব্যবহার করে না। ফলে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিকযুক্ত বর্জ্য পানি সরাসরি বা আংশিক প্রক্রিয়াজাত অবস্থায় খাল ও নদীতে ফেলা হয়। ঢাকা ও আশেপাশের জেলার নদী, খাল ও অন্যান্য জলাধারের নোংরা-দূষিত কালো পানি জনস্বাস্থ্যের জন্য যে মারাত্মক হুমকি সেটা আমাদের গুরুত্বের সাথে বোঝা দরকার।
রাজধানীর অনেক খালে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা শূন্যের কাছাকাছি, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। ডায়িং প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত রঙ ১০–৫০ শতাংশ পর্যন্ত সরাসরি পরিবেশে নিঃসৃত হয়, যা পানির রঙ পরিবর্তন করে এবং দ্রবীভূত অক্সিজেন কমিয়ে দেয়। এর ফলে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না। ঢাকার আশপাশের নদীগুলো—বিশেষ করে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা—এখন উচ্চমাত্রার রাসায়নিক ধাতু থাকায় জীববৈচিত্র্য বলতে কিছু অবশিষ্ট নেই, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারসহ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে এবং এই দূষিত পানি সেচের মাধ্যমে কৃষিজমিতে প্রবেশ করে খাদ্যচক্রে ঢুকে পড়ছে।
ঢাকার খালগুলোর সংকটের আরেকটি গোড়ার কারণ দখল। প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর দ্বারা খালের দুই পাড় দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে বছরের পর বছর। সরকারি উদ্যোগে মাঝে মাঝে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও তা টেকসই হয় না। কারণ দখলমুক্ত করার পরও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় খাল আবার দখল হয়ে যায়। এই চক্র ভাঙা না গেলে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পই দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না।
যদি পরিকল্পিতভাবে খালগুলো পুনরুদ্ধার করা যায়, তবে তা ঢাকার জন্য বহুমাত্রিক সুফল বয়ে আনতে পারে। প্রথমত, জলাবদ্ধতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। দ্বিতীয়ত, নগরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে। তৃতীয়ত, নৌপথভিত্তিক বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হতে পারে। চতুর্থত, খালপাড়কে কেন্দ্র করে নগর বিনোদন ও সবুজায়ন বৃদ্ধি পাবে। পঞ্চমত, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও পুনঃব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে, যা পানি সংকট মোকাবিলায় সহায়ক।
ঢাকার খাল, নদী ও অন্যান্য জলাধারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সরকারের নীতনির্ধারণ ও সিদ্ধান্তের ওপর। যদি বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকে, তবে আগামী এক দশকের মধ্যে রাজধানীর অধিকাংশ খাল সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। এতে জলাবদ্ধতা আরও তীব্র হবে, পরিবেশ দূষণ বাড়বে এবং শহরবাসীর জীবনমান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ড. মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: জনস্বাস্থ্য ও সমাজনীতি বিষয়ক গবেষক এবং শিক্ষক ও চেয়ারম্যান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ
- বিষয় :
- খাল
- রাজধানীর পানি নিষ্কাশন
