অন্যদৃষ্টি
বিচারের দীর্ঘসূত্রতা
ইফতেখারুল ইসলাম
প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
সোমবার নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার রায় দ্রুত কার্যকরের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন নিহতের আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসী। নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্যরাও একই দাবিতে মানববন্ধন করেছেন। এ ঘটনা বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদার একটা উদাহরণ হতে পারে।
সাত খুনের ঘটনাটি আজ থেকে ১২ বছর আগের। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনমতে, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড-সংলগ্ন এলাকা থেকে সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করা হয়েছিল। অপহরণের তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ছয়জনের ও পরদিন আরেকজনের লাশ পাওয়া যায়।
২০১৬ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালত র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তা– লে. কর্নেল (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) তারেক সাঈদ, মেজর (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) এমএম রানা, সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেনসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। পরে আসামিপক্ষের আপিলে ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট হাইকোর্ট নূর হোসেন, র্যাবের সাবেক ৩ কর্মকর্তাসহ ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। একই সঙ্গে ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৯ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজাও বহাল রাখা হয়। মামলাটি বর্তমানে লিভ টু আপিলের শুনানির অপেক্ষায়। এই প্রক্রিয়া শেষ না করে যে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া যায় না, তা আমরা বুঝি। ঘটনার এক যুগ পরও তা নিষ্পত্তি না হওয়া দুঃখজনক।
১৩ বছর আগে ২০১৩ সালের ৬ মার্চ এই নারায়ণগঞ্জের শায়েস্তা খান রোডের বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। দুই দিন পর শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী শাখা খাল থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সে হত্যাকাণ্ডের বিচারই এখন পর্যন্ত শুরু হয়নি।
এরই মধ্যে তনু হত্যাকাণ্ড নিয়ে সিআইডি তৎপর। অথচ ঘটনাটি ২০১৬ সালের ২০ মার্চের। সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে লাশ হন তনু। পরদিন তাঁর বাবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহায়ক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন। কিন্তু সে মামলায় তখন তেমন অগ্রগতি হয়নি।
১৪ বছর আগে ঢাকার নিজ বাসায় নির্মমভাবে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। এই ঘটনারও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হয়নি। এ ধরনের বহু ঘটনা রয়েছে, যেখানে বিশেষত রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অবহেলা কিংবা রাজনৈতিক কারণে মামলার যথাযথ তদন্ত হয়নি। তদন্ত হলেও রায় হয়নি, কিংবা রায় হলেও তা কার্যকর করা হয়নি।
বিচারের এ দীর্ঘসূত্রতা পুরো সমাজে নানা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অপরাধীরা দ্বিগুণ আশকারায় আরও অপরাধকর্মে জড়াচ্ছে। নতুন নতুন অপরাধীরও জন্ম হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জেরই গত শুক্রবারের ঘটনা। সেখানকার ফতুল্লার রেলস্টেশনে ঘটে গেল অবিশ্বাস্য ঘটনা! কারা-জীবনের অভিজ্ঞতা নিতে ১৩ থেকে ১৭ বছরের কয়েক মাদকাসক্ত কিশোর ১১ বছরের এক কিশোরকে হত্যা করেছে।
এ পরিস্থিতি সমাজকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে– সবারই ভাবা দরকার। বিশেষ করে আইনের শাসনের জন্য তা কতটা ক্ষতিকর, সে কথা বুঝতে হবে। বর্তমান সরকার তার পূর্বসূরিদের মতোই সকল ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দেশে আইনের শাসন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু সে–অঙ্গিকার পূরণে তারা যদি পূর্বসূরিদেরই অনুসরণ করে, তাহলে এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক কিছু হতে পারে না।
ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
- ইফতেখারুল ইসলাম
