অন্যদৃষ্টি
বিতর্কে মুন্সিয়ানা, মব নিয়ন্ত্রণে নয়
ইফতেখারুল ইসলাম
প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬ | ০৮:১৮ | আপডেট: ০৩ মে ২০২৬ | ১৩:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মব সহিংসতা দেখা দেয়। তখন সংবাদমাধ্যমসহ নাগরিক সমাজের মূলধারার বক্তব্য ছিল, নির্বাচিত সরকার এলে মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। তা ছাড়া ড. ইউনূসের দুর্বল সরকারের কারণে মববাজরা আশকারা পেয়েছে। কিন্তু মানবাধিকার সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনমতে, নির্বাচিত সরকার মবের লাগাম এখনও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। বরং এ ধরনের ঘটনা এরই মধ্যে বেড়েছে।
সমকাল এমএসএফের প্রতিবেদনের বরাতে জানিয়েছে, ২০২৬ সালের এপ্রিলে সারাদেশে মব বা গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে ৪৯টি, যেখানে ২১ জন নিহত হয়েছেন। মার্চে মবের ঘটনা ছিল ৩৬টি, যেখানে ১৯ ব্যক্তি প্রাণ হারান।
আগের দুটি মাসের পরিসংখ্যান দেখলেও মবের ধারাবাহিক বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট। গত ফেব্রুয়ারিতে গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা ছিল ১৮; জানুয়ারিতে ২১ এবং ডিসেম্বরে ১০। এসব পরিসংখ্যান আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং অপরাধ দমনে নির্বাচিত সরকারের দুর্বলতাকেই উদোম করে দেয়।
প্রতিবেদনে কেবল মবের ঘটনাই উঠে আসেনি, বরং নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্রও সামনে এনেছে। প্রতিবেদনমতে, মার্চের তুলনায় এপ্রিলে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে। মার্চের চেয়ে এপ্রিলে ২৩টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেশি ঘটেছে। ৫৪টি ধর্ষণ ও ১৪টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তবে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা মার্চের তুলনায় এপ্রিলে কমেছে।
দেশে মব বা গণপিটুনির ক্রমবর্ধমান প্রবণতা আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকারের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। এ বাস্তবতায় সরকারকে তাৎক্ষণিক, কার্যকর ও বহুমাত্রিক উদ্যোগ নিতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে মবের ঘটনা বাড়তেই থাকবে। বিশেষত স্থানীয় পর্যায়ে বিচারিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত দুর্বল; জমি-সংক্রান্ত বিরোধ থেকে যা খুনোখুনি পর্যন্ত গড়ায়। অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে কেউ কেউ সঠিক বিচার পেতেও ব্যর্থ হয়।
এ ধরনের পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা জড়িত। ফলে সহজেই এখন মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয় এবং অপরাধে জড়িত হওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের আওতায় এনে স্বল্প সময়ে রায় কার্যকর করা গেলে অপরাধীদের মধ্যে ভীতি তৈরি করা সম্ভব। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে এ ধরনের সহিংসতা থামানো কঠিন।
পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকাও মবের ঘটনায় ইন্ধন যুগিয়েছে। এই পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বাড়াতে হলে জবাবদিহিমূলক প্রশাসনের বিকল্প নেই। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে নিয়মিত টহল এবং জরুরি হটলাইন সক্রিয় করা যেতে পারে। ৯৯৯-এ কেবল ফৌজদারি অপরাধ হলে পুলিশ হস্তক্ষেপ করতে যায়; অন্যথায় আবেদন খারিজ করে দেয়। কিন্তু সামান্য জমিজমার বিরোধ থেকেও পরিস্থিতি ফৌজদারি অবস্থায় গড়াতে পারে। এটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মাথায় রাখতে হবে।
গুজব ও ভুয়া তথ্যের কারণেও মবের ঘটনা ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে জনগণকে ডিজিটাল সচেতনতা বিষয়ে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিতে পারে। একইভাবে গুজববাজদের ব্যাপারেও সতর্কতা জরুরি।
মবের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন নিশ্চয় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। মসজিদ, মন্দির ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সচেতনতামূলক বক্তব্য এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু মূল ভূমিকা রাখতে হবে সরকারকেই। আরও ভেঙে বললে, এ ধরনের পরিস্থিতির দায়-দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের।
লক্ষণীয়, সংসদের বিভিন্ন বিতর্কে আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুন্সিয়ানা দেখতে পাই। কিন্তু মব সহিংসতার মতো ঘটনায় দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাঁর মন্ত্রণালয়ের দুর্বলতা স্পষ্ট। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি সংসদে বিতর্কের মুন্সিয়ানা মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণেও দেখাতে পারেন?
ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
- ইফতেখারুল ইসলাম
