ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

ব্যাংক ঋণ বটে!

ব্যাংক ঋণ বটে!
×

ইফতেখারুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ | ০৭:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

একদিকে প্রযুক্তি দিন দিন উৎকর্ষ লাভ করছে, অন্যদিকে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু চক্র প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে। প্রতারণার ধরনও ক্রমবর্ধমান পাল্টে যাচ্ছে। সম্প্রতি ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদনে অবিশ্বাস্য এক চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে, যারা ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যম দিয়ে ব্যবহারকারীদের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এই পরিস্থিতি শুধু উদ্বেগজনক নয়; এটি আমাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতাকেও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে আসে।

প্রতারকরা ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও ইনস্টাগ্রামে লোভনীয় বিচিত্র ধরনের বিজ্ঞাপন ছড়িয়ে দিয়েছে, যেখানে অল্প সুদে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের প্রস্তাব করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনমতে, ১৯টি পেজের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও ব্যবহৃত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তারা দেশি-বিদেশি বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করছে, যেখানে বিশ্বব্যাংকও অন্তর্ভুক্ত। প্রলোভনে পড়ে অনেকে ফাঁদেও পড়েছে। 

শুধু বিশ্বব্যাংক নয়; বাংলাদেশ ব্যাংক, ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ এবং ব্যাংক অব আমেরিকার নাম ও লোগো ব্যবহার করেও ভুয়া ঋণের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) এবং ফার্স্ট হরাইজন ব্যাংকের নামও ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিজ্ঞাপনগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই। যদিও বিশ্বব্যাংক ব্যক্তিকে ঋণ দেয় না, এর পরও ব্যবহারকারীরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। এই প্রতারণার ধরন অত্যন্ত কৌশলী। মাত্র ১৫ সেকেন্ডের ভিডিওতে এআই-নির্মিত চরিত্র ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলে ধরা হচ্ছে। সেখানে বলা হচ্ছে, ৫০ হাজার থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ স্বল্প সুদে, সহজ শর্তে পাওয়া যাবে। বাস্তবে এমন সুবিধা কোনো স্বীকৃত আর্থিক প্রতিষ্ঠান এত সহজে প্রদান করে না। অথচ প্রযুক্তির চাতুর্য ও প্রতিষ্ঠানের নামের বিশ্বাসযোগ্যতা; এই দুইয়ের সমন্বয়ে প্রতারকরা সাধারণ ব্যবহারকারীদের ফাঁদে ফেলতে সক্ষম হচ্ছে।

এ ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, স্পন্সরড বিজ্ঞাপন হিসেবে এগুলো হাজারো ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছাচ্ছে। অর্থাৎ প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপন যাচাই ব্যবস্থায় স্পষ্ট দুর্বলতা রয়েছে। ফেসবুক কোম্পানি মেটা দীর্ঘদিন কনটেন্ট মডারেশন ও ভুয়া তথ্য প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবতা হলো, অ্যালগরিদমিক ব্যবস্থায় এখনও বড় ধরনের ফাঁক রয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই দায় কার? প্রথমত, প্ল্যাটফর্মগুলোর দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। স্পন্সরড কনটেন্ট থেকে তারা সরাসরি অর্থ উপার্জন করে। তাই বিজ্ঞাপনের উৎস ও সত্যতা যাচাই করা তাদের বাধ্যবাধকতার মধ্যেই পড়ে। দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া জরুরি। তাদের নাম ও লোগোর অপব্যবহার হলে দ্রুত জনসচেতনতা তৈরি এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তা ছাড়া প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী অপরাধ ও প্রতারণা বেড়েই চলেছে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে। সাইবার অপরাধ দমন ইউনিট, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু প্রতারণা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়; বরং প্রতিরোধমূলক নজরদারি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

সব শেষে, ব্যবহারকারীদের সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা। কোনো আর্থিক প্রস্তাব যদি অস্বাভাবিকভাবে সহজ ও লাভজনক মনে হয়, তবে সেটি সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। যাচাই ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য বা অর্থ লেনদেন করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

ডিজিটাল যুগে প্রতারণার রূপ বদলেছে। কিন্তু মূল উদ্দেশ্য একই– মানুষকে বিভ্রান্ত করে আর্থিক লাভ করা। ওয়েবসাইট হ্যাক করে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও অর্থ লুট করার কথা আমরা জানি। তাই প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সতর্কতা ও দায়বদ্ধতাও সমানভাবে বাড়াতে হবে। অন্যথায় এ ধরনের প্রতারণা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, সামগ্রিকভাবে আর্থিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাকেও দুর্বল করে দেবে।

ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল  

আরও পড়ুন

×