ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাজস্ব

করহার বৃদ্ধির বদলে করজাল সম্প্রসারণ জরুরি

করহার বৃদ্ধির বদলে করজাল সম্প্রসারণ জরুরি
×

স্নেহাশীষ বড়ুয়া

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ | ০৮:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

রহিম ও করিম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু এবং দুটি কোম্পানির সিইও। রহিম প্রতি মাসে ১৫ লাখ টাকা বেতন পান; তাঁর নিয়োগকর্তা উৎসে কর কেটে তা সরকারি কোষাগারে জমা দেন। করিমও মাসে প্রায় একই পরিমাণ অর্থ আয় করেন, তবে তাঁর বেতনের মাত্র ৩০ শতাংশ ব্যাংক স্থানান্তরের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়, বাকি ৭০ শতাংশ দেওয়া হয় নগদে।

রহিম তাঁর আয় ও সম্পদ নিজের আয়কর রিটার্নে পুরোপুরি প্রকাশ করেন। ফলস্বরূপ ঘোষিত আয় তাঁর সম্পদ বৃদ্ধিকে যৌক্তিকতা দেয়। কিন্তু করিম তাঁর সম্পদের পুরোটা ঘোষণা করতে পারেন না। কারণ তাঁর সম্পদ বৃদ্ধি তাঁর ঘোষিত আয়ের তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে অনেক বেশি। বর্তমান সময়ে এই দৃশ্যপট বেশ পরিচিত।

অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির সুযোগ নিয়ে কোম্পানিগুলো প্রায়ই তাদের আয় কমিয়ে দেখায়। তাদের ব্যয়গুলো একইভাবে অপ্রকাশিত থেকে যায়। এ পরিস্থিতিতে   ব্যক্তিশ্রেণির সর্বোচ্চ ধাপের আয়কর হার বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করার কথা ভাবছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) (ইত্তেফাক, ৩১ মার্চ, ২০২৬)। কিন্তু এতে সরকার কতটা লাভবান হবে?

বর্তমানে বাংলাদেশের করজাল বিপজ্জনকভাবে সংকীর্ণ। ১.২৮ কোটি নিবন্ধিত ই-টিআইএনধারীর মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আয়কর রিটার্ন জমা দেন না। অথচ এদের সঙ্গে ছায়া অর্থনীতিতে বিচরণকারী লাখ লাখ মানুষকে করের আওতায় আনার পদক্ষেপ না নিয়ে, নিয়ম মেনে কর প্রদানকারীদের কাছ থেকে আরও বেশি আদায়ের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এনবিআরের তথ্যমতে, উচ্চ আয়ের ব্যক্তিরা বর্তমানে মোট ব্যক্তিশ্রেণির আয়করের প্রায় ২৩ শতাংশ বহন করেন। উপরন্তু সম্পদ সারচার্জের কারণে দেশে ইতোমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম ভারী ব্যক্তিগত করের বোঝা চেপে আছে। বিদ্যমান ৩০ শতাংশ সর্বোচ্চ করহারের সঙ্গে ৩৫ শতাংশ সারচার্জ মিলে কার্যকর করহার দাঁড়ায় প্রায় ৪০ শতাংশ। মূল করহার ৩৫ শতাংশে উন্নীত হলে এই কার্যকর কর ৪৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। এমনকি যদি সারচার্জ প্রত্যাহৃত হয়ে সম্পদ কর চালু হয়, তবুও একজন ব্যক্তিকে তাঁর আয়ের ওপর ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হতে পারে, যেহেতু সম্পদ কর কোনোভাবেই করদায়ের চেয়ে বেশি হবে না।

উচ্চ নিট সম্পদশালী ব্যক্তিরাই দেশীয় মূলধন গঠনের প্রধান উৎস। তারা স্টার্টআপগুলোতে অর্থায়ন করেন; করপোরেট ইকুইটি বজায় রাখেন এবং প্রতিবছর আমাদের শ্রমবাজারে প্রবেশ করা অনেক তরুণের জন্য কর্মসংস্থান করেন। শাস্তিমূলক ব্যক্তিগত কর তাদের পুনর্বিনিয়োগযোগ্য উদ্বৃত্তকে নিঃশেষ করে দেয় এবং উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা ধ্বংস করে। তখন স্থানীয় শিল্পের পরিবর্তে মূলধন অনিবার্যভাবেই নিম্ন-করের দেশগুলোতে আশ্রয় খুঁজবে অথবা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে ফিরে যাবে।

ইতিহাস প্রমাণ করে– উচ্চ করহার কখনোই উচ্চতর কর পরিপালনের নিশ্চয়তা দেয় না। ২০১৪ সাল থেকে করহারের ওঠানামা হলেও রিটার্ন দাখিলের হার স্থবির হয়ে আছে। জানুয়ারিতে গঠিত জাতীয় টাস্কফোর্স কর কাঠামোর যৌক্তিকীকরণের সুপারিশ করেছিল; করের ভারী বোঝা নয়। তাই সরকারকে অবশ্যই করজাল ও করভিত্তি সম্প্রসারণ এবং বিশাল পরিপালন ঘাটতি কমানোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মূলধন পাচার রোধ এবং দেশীয় বিনিয়োগ সুরক্ষার জন্য ৩৫ শতাংশ সর্বোচ্চ ব্যক্তি করহার নির্ধারণের আগে অবশ্যই অংশীজনদের যুক্ত করে এর ভালো-মন্দ বিচার করতে হবে।

২০২২-২৩ সালের জন্য এনবিআরের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় এক লাখ সাত হাজার করদাতা সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ ধাপে কর দিচ্ছিলেন। অর্থনীতির আকার বিবেচনায় কেউ বলতে পারেন, এই ভিত্তি খুবই ক্ষুদ্র। তাই বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপানোর পরিবর্তে আমাদের কর আদায় বাড়াতে ভিন্ন কিছু করতে হবে। অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার উদ্যোগও শুরু করা দরকার। নগদ অর্থনির্ভর এবং কর ফাঁকি দেওয়া ব্যবসাগুলোকে (অর্থনীতির ‘করিম’দের) আনুষ্ঠানিক করজালে আনতে কঠোর ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং অডিটিং মেকানিজম প্রয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি কার্যকর করের বোঝাকে যৌক্তিক করতে হবে। আয়কর ও সম্পদ সারচার্জের যৌথ প্রভাবটির পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। মোদ্দা কথা, সামগ্রিক কার্যকর করহার যেন বৈশ্বিক বিবেচনায় প্রতিযোগিতামূলক থাকে, যাতে সম্পদ প্রকাশ এবং স্থানীয় পুনর্বিনিয়োগ উৎসাহিত হয়। কর পরিপালনে স্বচ্ছতাকে পুরস্কৃত করার জন্য করনীতির পুনর্গঠন দরকার। সৎ করদাতারাই কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রধান চালিকাশক্তি– এ স্বীকৃতিও গুরুত্বপূর্ণ।

স্নেহাশীষ বড়ুয়া: কর বিশেষজ্ঞ; পরিচালক, এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস

আরও পড়ুন

×