খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা
কৃষিতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সময় এখনই
সোলার সেচ পাম্প হতে পারে দেশের কৃষি খাতের জন্য যুগান্তকারী সমাধান
রঞ্জন কুমার দে
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ১৫:২৭ | আপডেট: ১১ মে ২০২৬ | ১৬:০০
জীবাশ্ম জ্বালানি বর্তমান বিশ্বের ক্ষমতার অন্যতম প্রধান নির্ধারক হয়ে উঠেছে। এর সরবরাহের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালীর মতো কৌশলগত নৌপথের ওপর নির্ভরশীল। এই প্রণালী নিয়ন্ত্রণের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব এতটাই বেশি যে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিকেও আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সামান্য অস্থিরতাও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অভিঘাত সৃষ্টি করে। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয় আমদানিনির্ভর দেশগুলো, যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
বর্তমানে দেশের সেচ পাম্পগুলোর প্রায় ৭৪ শতাংশ ডিজেল চালিত। দেশের মোট ডিজেল চাহিদার প্রায় ২২ শতাংশ এই কৃষি সেচ খাতেই ব্যবহৃত হয়। বিদ্যুৎ চালিত সেচ পাম্প রয়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ, আর সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাম্পের সংখ্যা মাত্র ১ শতাংশের কাছাকাছি। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়—আমাদের কৃষি এখনও কতটা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশে প্রায় ১২ থেকে ১৩ লাখ ডিজেল চালিত সেচ পাম্প সক্রিয় রয়েছে, যা বছরে প্রায় ১৭ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল ব্যবহার করে। এই বিপুল জ্বালানি আমদানিতে সরকারকে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হয়। এটি শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করে না, বরং কৃষকদের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়িয়ে দেয়। ডিজেলের দাম বাড়লেই সরাসরি বাড়ে ধান উৎপাদনের খরচ।
বিশেষ করে বোরো ধান চাষ, যা বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি, প্রায় পুরোপুরি সেচনির্ভর। সেচ ব্যয় মোট উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ফলে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি মানেই কৃষকের লোকসান, উৎপাদন কমে যাওয়া এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়া।
অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি ডিজেলভিত্তিক সেচ পরিবেশের জন্যও অত্যন্ত ক্ষতিকর। একটি গড় ৪ হর্সপাওয়ারের ডিজেল পাম্প বছরে প্রায় ৩,৭৪৪ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করে। দেশের লক্ষ লক্ষ পাম্প মিলিয়ে এই কার্বন নিঃসরণ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। ধোঁয়া, শব্দ দূষণ এবং যান্ত্রিক ত্রুটির বাড়তি ঝামেলাও কৃষকের জীবনকে কঠিন করে তোলে।
এই বাস্তবতায় কৃষিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার আর বিলাসিতা নয়, বরং জাতীয় প্রয়োজন। বিশেষ করে সোলার সেচ পাম্প হতে পারে বাংলাদেশের কৃষি খাতের জন্য একটি যুগান্তকারী সমাধান।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান সোলার সেচের জন্য অনুকূল। বছরে প্রায় ৩০০ দিন সূর্যালোক পাওয়া যায় এবং গড় সৌর বিকিরণ প্রতি বর্গমিটারে প্রতি ঘন্টায় ৪ থেকে ৬.৫ কিলোওয়াট, যা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আদর্শ। সমতল ভূমি এবং বিস্তৃত কৃষিজমিও এই প্রযুক্তির বাস্তবায়ন সহজ করে।
বর্তমানে সরকারের আইডিসিওএল এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন সোলার সেচ পাম্প সম্প্রসারণে কাজ করছে। বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গের কিছু এলাকায় দেখা গেছে, যেখানে ডিজেল পাম্পে প্রতি ডেসিমাল জমিতে সেচ খরচ প্রায় ৪০ টাকা, সেখানে সোলার পাম্পে তা নেমে এসেছে মাত্র ২৫ পয়সায়। এই পার্থক্য কৃষকের জন্য শুধু সাশ্রয় নয়, বরং অর্থনৈতিক মুক্তি।
এখানে ‘নেট মিটারিং’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হতে পারে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে স্রেডা কার্যকর নীতিগত ভিত্তি তৈরি করেছে। সোলার সেচ পাম্প সাধারণত বছরে কয়েক মাস—বিশেষ করে বোরো মৌসুমে—সক্রিয়ভাবে ব্যবহৃত হয়। বছরের বাকি সময় প্যানেলগুলো প্রায় অব্যবহৃত পড়ে থাকে। যদি জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযোগ দিয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ তৈরি করা যায়, কৃষক বা সমবায় অতিরিক্ত আয় করতে পারবে। নতুন নেট মিটারিং নীতিমালায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ এই সম্ভাবনাকে আরও বাস্তব করেছে।
তবে এই খাতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এককালীন বিনিয়োগ। একটি ডিজেল পাম্প তুলনামূলক কম খরচে দ্রুত স্থাপন করা যায়। একটি পূর্ণাঙ্গ সোলার সেচ পাম্প বসাতে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, সাবমারসিবল পাম্প, পাইপলাইন, কন্ট্রোলার এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যাটারি বা গ্রিড সংযোগের জন্য উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে এককালীন এই ব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব।
সেক্ষত্রে আমরা ভারত, চীন, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ এবং নেপালের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারি। ভারতের পিএম-কুসুম স্কিম বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সোলার সেচ কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত। এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো উচ্চমাত্রার সরকারি ভর্তুকি। অনেক ক্ষেত্রে সরকার সোলার পাম্প স্থাপনের মোট ব্যয়ের ৬০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সহায়তা দেয়। এর ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরাও সহজে এই প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারেন। শুধু তাই নয়, কৃষক তার সেচ কাজ শেষে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রি করতে পারে। ভারত সরকার এই ধারণাকে জনপ্রিয় করেছে “অন্নদাতা থেকে বিদ্যুৎদাতা” স্লোগানে। অর্থাৎ কৃষক শুধু খাদ্য উৎপাদক নয়, তিনি বিদ্যুৎ উৎপাদকও। এতে কৃষকের নিয়মিত অতিরিক্ত আয় নিশ্চিত হয়। অনেক রাজ্যে মাঠভিত্তিক সমবায়ের মাধ্যমে বড় সোলার প্ল্যান্ট স্থাপন করে পুরো গ্রামের সেচ ব্যবস্থাকে সৌরনির্ভর করা হয়েছে।
চীন আরও বড় পরিসরে ‘এগ্রি-ভোল্টাইক’ মডেল ব্যবহার করছে। সেখানে কৃষিজমির ওপর উঁচু কাঠামোতে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়। এতে জমির ব্যবহার বন্ধ না হয়। প্যানেলের নিচে ছায়া-সহনশীল ফসল—যেমন বিভিন্ন সবজি, মসলা বা ভেষজ উদ্ভিদ—চাষ করা হয়, আর ওপরের অংশে চলে বিদ্যুৎ উৎপাদন। অর্থাৎ একই জমি থেকে একসঙ্গে খাদ্য ও বিদ্যুৎ—দুই ধরনের উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। এই বিদ্যুৎ ব্যবহার করে বড় ক্যানাল বা জলাধার থেকে পানি তুলে সেচ দেওয়া হয়। বৃহৎ পরিসরে এই ব্যবস্থায় তারা উল্লেখযোগ্যভাবে খরচ কমিয়ে কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করেছে।
আফ্রিকার দেশগুলো—বিশেষ করে ইথিওপিয়া ও কেনিয়ায়—সোলার সেচের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মডেল দেখা যায়, যার নাম পে এজ ইউ গো। এসব দেশে বিদ্যুৎ অবকাঠামো দুর্বল এবং অনেক এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর গভীরে হওয়ায় ডিজেলনির্ভর সেচ ব্যয়বহুল। সেখানে সরকার বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বড় সোলার পাম্প স্থাপন করে দেয়, আর কৃষকরা সমবায়ের মাধ্যমে যতটুকু পানি ব্যবহার করে, ততটুকুর মূল্য পরিশোধ করে। এটি অনেকটা মোবাইল রিচার্জের মতো। ফলে কৃষকদের এককালীন বড় বিনিয়োগ করতে হয় না। ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য এই মডেল অত্যন্ত কার্যকর, কারণ তারা ঋণের ফাঁদে না পড়ে সহজে সেচ সুবিধা পায়।
নেপাল পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে সেচ ব্যবস্থায় ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। সেখানে নিচু এলাকা থেকে পানি ওপরে তুলে কৃষিজমিতে পৌঁছে দেওয়া একটি বড় সমস্যা। এই বাস্তবতায় তারা সৌরবিদ্যুৎচালিত লিফট সেচ ব্যবস্থাকে কার্যকর সমাধান হিসেবে গ্রহণ করেছে। তবে এই প্রকল্পগুলোর সাফল্যের মূল ভিত্তি শুধু প্রযুক্তি নয়, বরং শক্তিশালী স্থানীয় কৃষি সমবায়। ‘ওয়াটার ইউজারস অ্যাসোসিয়েশন’ এর মাধ্যমে পাম্প পরিচালনা, পানি বণ্টন, রক্ষণাবেক্ষণ, তহবিল ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। সেখানকার কৃষকরা নিয়মিত সেচ ফি প্রদান করে একটি স্থায়ী তহবিল গড়ে তুলেছেন। এখান থেকেই ভবিষ্যৎ মেরামত ও যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপনে ব্যয় করা হয়। এর ফলে প্রকল্পটি কেবল সরকারি উদ্যোগ হিসেবে নয়, কৃষকের নিজস্ব সম্পদ হিসেবে গড়ে ওঠেছে। এই স্থানীয় মালিকানাবোধ এবং সামাজিক জবাবদিহিতাই নেপালের সোলার সেচ প্রকল্পগুলোকে দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর করেছে।
এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাগুলো বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। মাঠ পর্যায়ে এই পুরো ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়নে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক সমবায় গঠন, পাম্পের উপযোগিতা নির্ধারণ, নিয়মিত মনিটরিং এবং দ্রুত সমস্যা সমাধানে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ত করতে হবে। এজন্য আধুনিক সোলার প্রযুক্তি বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণও জরুরি।
এজন্য নীতিগতভাবে সরকারকে কয়েকটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সোলার প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির ওপর আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট কমাতে হবে। বাংলাদেশ যদি ২০৪১ সালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সেচ পাম্পকে সৌরচালিত করতে পারে, তবে বছরে লক্ষাধিক টন ডিজেল সাশ্রয় হবে, কার্বন নিঃসরণ কমবে এবং কৃষক আরও লাভবান হবে। সবচেয়ে বড় কথা, খাদ্য নিরাপত্তা আর বৈশ্বিক তেলের বাজারের জিম্মি হয়ে থাকবে না।
রঞ্জন কুমার দে: সাংবাদিক ও অ্যাকটিভিস্ট
- বিষয় :
- সৌরবিদ্যুৎ
- কৃষি
- সেচপাম্প
- নবায়নযোগ্য জ্বালানি
