অন্যদৃষ্টি
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর জন্য বই
তালুকদার রিফাত পাশা
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ | ০৭:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বর্তমানে সারাবিশ্বে প্রায় ২৮৫ মিলিয়ন মানুষ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। বিশ্বের এত বড় জনগোষ্ঠীর অন্যতম বাধা হচ্ছে তাদের উপযোগী মাধ্যমের বইপ্রাপ্তি। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা ব্রেইল, অডিও, ডিজিটাল মাধ্যম এবং বড় হরফের মাধ্যমে পড়ার সুযোগ পান। কিন্তু বিপত্তি বাধে তখনই যখন তারা তাদের উপযোগী মাধ্যমের বই পান না। সে সমস্যা দূর করার লক্ষ্যে বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থা মারাকেশ চুক্তি নামে একটি বিশেষ সনদ গ্রহণ করে ২০১৩ সালে। বাংলাদেশ সে সনদের অংশ হয় ২০২২ সালে। মারাকেশ চুক্তির সমর্থনের চার বছর অতিক্রান্ত হলেও এটি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ বেশ পিছিয়ে। এ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কিছু বাধা চোখে পড়ে।
মারাকেশ চুক্তির মূলকথা হচ্ছে, কোনো লেখক বা প্রকাশকের অনুমতি ব্যতিরেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর প্রয়োজন অনুযায়ী যে কোনো বই ব্রেইল, অডিও, ডিজিটাল মাধ্যম এবং বড় হরফে মুদ্রিত কপি তৈরি করতে পারবে। এ চুক্তির আওতায় স্বাক্ষরকারী কোনো দেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ অপর স্বাক্ষরকারী দেশের যে কোনো বই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য পাঠ উপযোগী করতে পারবে। সে ক্ষেত্রেও কোনো অনুমতির প্রয়োজন নেই। তবে স্বাক্ষরকারী দেশকে তার নিজ দেশের আইনকে উপযোগী করতে হবে যেন সহজে বাস্তবায়ন করা যায়। এরই অংশ হিসেবে সনদটি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের মেধাস্বত্ব আইনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়। অনেকের ভুল ধারণা আছে, এটি যদি বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে প্রকৃত যে মেধাস্বত্ব, সেটি নষ্ট হবে। অর্থাৎ মানুষ এর সুযোগে নানাভাবে মেধাস্বত্ব আইন লঙ্ঘন করবে।
দ্বিতীয়ত, প্রকাশকদের মাঝে মারাকেশ চুক্তি নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। আমাদের দেশের প্রায় সব প্রকাশনা সংস্থা চুক্তিটি সম্পর্কে একেবারেই জানেন না। ফলে তারা ভাবেন, প্রকাশনা সংস্থার অনুমতি ব্যতিরেকে যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাদের বই রূপান্তর বা পরিবর্তন করলে একটি বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এর মাধ্যমে বই বা অন্যান্য উপকরণ পাইরেটেড হয়ে যেতে পারে।
তৃতীয়ত, মারাকেশ চুক্তির মূলকথা হলো, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রয়োজনে যে কোনো বই তাদের পাঠ উপযোগী করতে হবে। সে লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলবে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো গ্রন্থাগারে তাদের উপযোগী বই তৈরির জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া। বাস্তবতা হলো, বর্তমানে আমাদের দেশের কোনো গ্রন্থাগারেই প্রযুক্তি নেই। তথ্য আরও বলছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি করে রিসোর্স সেন্টার করা হয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য। সেগুলোতেও পর্যাপ্ত সহায়তার অভাব পরিলক্ষিত।
চতুর্থ বাধা আমার কাছে মনে হয় সমন্বয়ের অভাব। চুক্তিটি বাস্তবায়নের সার্বিক দায়িত্বে আছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। এটি সঠিকভাবে প্রতিপালন করা হচ্ছে কিনা, তা দেখভাল করার জন্য রয়েছে কপিরাইট ডিভিশন বাংলাদেশ সরকার। আর দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বই তৈরির দায়িত্ব হচ্ছে লাইব্রেরি, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রতিবন্ধী নিয়ে কর্মরত উন্নয়ন সংস্থা। কিন্তু অদ্যাবধি আমরা এমন কোনো উদ্যোগের কথা শুনতে পাইনি সরকারের পক্ষ থেকে, যাতে চুক্তিটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে বলে মনে হয়।
মারাকেশ চুক্তিটি বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে বাধাগুলো দূর করা খুব কঠিন কাজ নয়। প্রয়োজন কয়েকটি ত্বরিত পদক্ষেপ। যেমন দেশের কপিরাইট ডিভিশনে মারাকেশ চুক্তি সঠিক ও মসৃণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে কপিরাইট বিভাগে একটি পৃথক পদ তৈরি করা। শুধু সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় নয়; শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এ কাজে যুক্ত করতে হবে। এর ফলে স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আরও সহজে বইপ্রাপ্তির সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তালুকদার রিফাত পাশা: পলিসি কর্মকর্তা, ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবিয়িং বাংলাদেশ
[email protected]
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
