চারদিক
সামাজিকমাধ্যমে নেতিবাচক ঘটনার প্রভাব
জেরিন তাসনিম
প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ | ০৭:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই মোবাইল স্ক্রিনে আঙুল বোলানো এখন আমাদের প্রাত্যহিক অভ্যাস। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার যেখানেই আমরা স্ক্রল করি না কেন, চোখের সামনে ভেসে ওঠে যুদ্ধ, সহিংসতা, দুর্ঘটনা কিংবা কোনো সামাজিক অবক্ষয়ের খবর। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে আমরা কেবল পৃথিবীর খবরাখবর রাখছি। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। সামাজিক মাধ্যমের এই অনবরত নেতিবাচক খবরের প্রবাহ আমাদের মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতার ওপর ভীষণ ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।
আমাদের মস্তিষ্কে অ্যামিগডালা নামে বাদামের আকৃতির একটি অংশ রয়েছে, যা মূলত ভয়, বিপদ এবং স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ করে। যখনই আমরা সামাজিক মাধ্যমে কোনো ভয়াবহ বা নেতিবাচক খবর দেখি, অ্যামিগডালা এটিকে একটি বাস্তব বিপদ হিসেবে ধরে নেয় এবং শরীরকে সতর্ক করার জন্য কর্টিসিল ও অ্যাড্রেনালিন নামক স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ করে। প্রতিনিয়ত এভাবে হরমোন নিঃসরণের ফলে মস্তিষ্ক সবসময় একটি কাল্পনিক যুদ্ধে থাকে; যা দীর্ঘমেয়াদে মানুষকে খিটখিটে, ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত করে তোলে।
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, এই খারাপ খবরগুলো দেখার পরও আমাদের আঙুল স্ক্রিন স্ক্রল করা থামায় না। অনবরত এই নেতিবাচক তথ্য আমাদের মস্তিষ্কের ভেতরে এক ধরনের ভ্রান্ত বিশ্বাসের জন্ম হয় যে, ‘পুরো পৃথিবীটাই হয়তো অনিরাপদ এবং বসবাসের অযোগ্য’। এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের স্বাভাবিক সামাজিক আস্থা কমিয়ে দেয় এবং তীব্র প্যানিক অ্যাটাক বা ক্রনিক অ্যানজাইটি তৈরি করে; যা সরাসরি আমাদের রাতের ঘুম এবং বিশ্রামের সাইকেলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
একই সঙ্গে একের পর এক নেতিবাচক তথ্যের কারণে মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ক্ষমতাকে ভয়াবহভাবে ব্যাহত করে। যখন মন সারাক্ষণ কোনো একটা প্রচ্ছন্ন ভয়ে আচ্ছন্ন থাকে, তখন স্বাভাবিক কাজ বা পড়াশোনায় একাগ্রতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত ভীতি ও আশঙ্কার কারণে মস্তিষ্কের যৌক্তিক চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার অংশটি দুর্বল হয়ে পড়ে, যার ফলে মানুষ জীবনের ছোটখাটো বিষয়েও দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে শুরু করে।
এর চেয়েও ভয়ংকর বিষয় হলো নেতিবাচক খবরের এই ধারাবাহিক প্রবাহ একসময় মানুষকে পুরোপুরি অনুভূতিহীন করে তোলে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘কম্প্যাশন ফ্যাটিগ’। প্রতিদিন স্ক্রিনে শত শত মানুষের মৃত্যু, হাহাকার বা অন্যায়ের খবর দেখতে দেখতে আমাদের মস্তিষ্ক একসময় এসবে অভ্যস্ত হয়ে যায় এবং নতুন করে সহানুভূতি প্রকাশ করা বন্ধ করে দেয়। ফলে চারপাশের বাস্তব পৃথিবীর মানুষের প্রতিও আমাদের মানবিকতাবোধ এবং সহমর্মিতা কমতে শুরু করে; যা একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
ডিজিটাল এই যুগে বাস করে সামাহিক মাধ্যমকে জীবন থেকে পুরোপুরি বর্জন করা সম্ভব নয়, তবে সচেতনতা আমাদের এই মানসিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারে। এজন্য প্রতিদিনের রুটিনে কিছু সময়ের জন্য স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত জরুরি, বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে ও সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর। পাশাপাশি নিউজফিডের যেসব পেজ বা আইডি কেবলই নেতিবাচক কনটেন্ট ছড়ায়, সেগুলোকে আনফলো বা মিউট করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। ভার্চুয়াল জগতের বাইরে এসে বই পড়া, প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানো কিংবা সৃজনশীল কাজের অভ্যাস মস্তিষ্কে ডোপামিন ও সেরোটোনিন-এর মতো হরমোন বাড়াতে সাহায্য করে। স্ক্রিনের ওপারে থাকা তথ্যগুলো শুধু আমাদের চোখের সামনে ভাসছে না, তা সরাসরি আমাদের মস্তিষ্কে বিষক্রিয়া ঘটাচ্ছে। তাই সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য সচেতন হওয়া উচিত।
জেরিন তাসনিম: শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- চারদিক
