বাংলাদেশ-ভারত
সংকট ঢাকায় নয়, নয়াদিল্লিতেই
ফয়সাল মাহমুদ
ফয়সাল মাহমুদ
প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ | ০৭:২৩ | আপডেট: ২১ জুন ২০২৬ | ১১:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার আসার পর ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক নতুন করে ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারে– এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে অস্বস্তি ও অবিশ্বাস তৈরি হয়, তার অবসান ঘটবে বলেই মনে হয়েছিল।
শুরুটাও আশাব্যঞ্জক ছিল। ভারতের পক্ষ থেকে সম্পর্কের ধারাবাহিকতার কথা বলা হচ্ছিল। দুই দেশের মধ্যে নতুন করে আস্থার পরিবেশ তৈরির সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কে শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিয়ে বাস্তবতা বিচার করা যায় না। সম্পর্কের প্রকৃত অবস্থা বোঝা যায় মাঠপর্যায়ের আচরণ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক বার্তায়।
সম্প্রতি দিল্লি বিমানবন্দরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা সেই বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ঘটনার পর ঢাকার প্রতিক্রিয়া ছিল দ্রুত ও স্পষ্ট। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায় ভারপ্রাপ্ত ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করে। কারণ, বিষয়টি কেবল ব্যক্তির সঙ্গে আচরণের প্রশ্ন নয়; বরং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধির প্রতি আচরণের বিষয়।
ভারত সংক্ষিপ্তভাবে জানিয়েছে, তাঁকে ‘যাচাই-বাছাইয়ের’ জন্য অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু অনেকের কাছে এই ব্যাখ্যা যথেষ্ট মনে হয়নি। কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোনো সাধারণ যাত্রী নন। ইংরেজি দৈনিক ‘ডেইলি স্টার’ এক সম্পাদকীয়তে ঘটনাটিকে ‘দুর্ভাগ্যজনক এবং এড়ানো সম্ভব ছিল’ উল্লেখ করে লিখেছে, যদি ভারতের কোনো আপত্তি থেকেই থাকে, তাহলে সেটি কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে জানানো যেত। প্রকাশ্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করার প্রয়োজন ছিল না।
এই ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তেও উত্তেজনা বাড়ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কথিত অবৈধ অভিবাসীদের ‘পুশইন’ বা সীমান্ত পার করার ঘটনায় ঢাকা একাধিকবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের বক্তব্য স্পষ্ট; যথাযথ যাচাই ছাড়া এবং বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই অনেককে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ঢাকার কাছে এটি শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; দেশের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদার প্রশ্ন।
সীমান্তে আটকে পড়া মানুষের ছবি ও ঘটনা বাংলাদেশের জনমতেও প্রভাব ফেলছে। ফলে ভারতের প্রতি নেতিবাচক ধারণা আরও শক্তিশালী হচ্ছে, যা দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নের পথে নতুন বাধা তৈরি করছে।
বাস্তবতা হলো, দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দ্বিমত নেই। ভারতের জন্য বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী, একই সঙ্গে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে ভারতের অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক গুরুত্বও বাংলাদেশের জন্যও অনস্বীকার্য।
পাশাপাশি আরেকটি বাস্তবতা কাজ করছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারতের বাংলাদেশ নীতি মূলত শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা সেই কাঠামো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আর আগের মতো নেই।
ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবর্তনকে মেনে নিয়েছে। কিন্তু ভারতের নীতিনির্ধারণী মহলের একটি অংশের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে অস্বস্তি এখনও কাটেনি বলেই মনে হয়।
আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। বাংলাদেশের প্রতি ভারতের নীতি ক্রমেই পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাবের মধ্যে পড়ছে। অবৈধ অভিবাসন, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং জনমিতিগত পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য অনেক সময় এমন অবস্থান নেওয়ার রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়, যা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জনপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে নমনীয়তা কমিয়ে দেয়।
তবে দায় শুধু দিল্লির নয়। ঢাকা থেকেও কাঙ্ক্ষিত কূটনৈতিক সক্রিয়তা দেখা যায়নি। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সাংস্কৃতিক যোগাযোগকে। শাড়ি প্রদর্শনী, খাদ্য উৎসব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা অভিন্ন ঐতিহ্য তুলে ধরার উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু এগুলো কখনোই রাজনৈতিক কূটনীতির বিকল্প হতে পারে না। সফট পাওয়ার তখনই কার্যকর হয়, যখন তা কঠিন রাজনৈতিক আলোচনার সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ইতিহাসও সেই কথাই বলে। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বহু বছর ধরে ক্রিকেট কূটনীতি এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় চলেছে। কিন্তু নিরাপত্তা-সংকট দেখা দিলেই সেই উদ্যোগগুলো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। কারণ, রাজনৈতিক আস্থার ঘাটতি রয়ে গেছে।
একইভাবে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ভারতের গভীর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সম্পর্কও তামিল প্রশ্ন বা আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বিরোধ দূর করতে পারেনি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও রাশিয়ার মধ্যেও দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ছিল। কিন্তু মৌলিক ভূরাজনৈতিক বিরোধ সামনে আসার পর সেই সম্পর্ক দ্রুত ভেঙে পড়ে।
রাষ্ট্রগুলো শেষ পর্যন্ত একে অপরকে সাংস্কৃতিক কর্মসূচি দিয়ে নয়, রাজনৈতিক আচরণ ও সিদ্ধান্ত দিয়ে মূল্যায়ন করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেটিই প্রযোজ্য। সীমান্ত, পানিবণ্টন, অভিবাসন কিংবা বাণিজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো যখন সামনে এসেছে, তখন সাংস্কৃতিক উদ্যোগগুলো কাঙ্ক্ষিত কূটনৈতিক ফল দিতে পারেনি।
সব মিলিয়ে সমস্যাটি কোনো একক ঘটনা বা একক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিমানবন্দরে একজন উপদেষ্টাকে আটকে রাখা, সীমান্তে পুশব্যাক, কূটনৈতিক প্রতিবাদ কিংবা পরস্পরের প্রতি বাড়তে থাকা সন্দেহ– এসব ঘটনা মিলেই একটি বৃহত্তর চিত্র তৈরি করছে। সেই চিত্রটি হলো, দুই দেশই সম্পর্কোন্নয়নের কথা বলছে, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে এখনও অবিশ্বাস পুরোপুরি দূর হয়নি।
প্রশ্ন হচ্ছে– বাংলাদেশ ও ভারত কি জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারবে? এ মুহূর্তে সেই প্রশ্নের উত্তর পুরোপুরি ইতিবাচক নয়। সরকারি পর্যায়ে সহযোগিতার কথা বলা হলেও বাস্তব ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, পুরোনো মানসিকতা, রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ এবং পারস্পরিক সন্দেহ এখনও সম্পর্কের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে।
আর সে কারণেই বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি হয়তো ঢাকায় নয়, দিল্লিতেই।
ফয়সাল মাহমুদ : সাংবাদিক
- বিষয় :
- ভারত
