ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক

ইরান-মার্কিন চুক্তিতে বিজয়ের আগেই বিজয়োল্লাস?

ইরান-মার্কিন চুক্তিতে বিজয়ের আগেই বিজয়োল্লাস?
×

অ্যাডলফো ফ্রাঙ্কো

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ | ০৭:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

মানবেতিহাসে এমন এক বিশেষ ধরনের চুক্তি রয়েছে, যা স্বাক্ষরের দিন বিজয়ের অনুভূতি হয়, কিন্তু তার পরের প্রতিটি দিনই সেই বিজয় ক্ষয় হয়। ট্রাম্প প্রশাসন এই সপ্তাহে ইরানের সঙ্গে যে ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে, তা ঠিক সেই রকম বিজয়েরই রূপ নিচ্ছে। এ এমন এক বিজয়, যার পরিণাম বোঝার আগেই দ্রুত করতালি দিতে হয়। 

যা সত্যিই বিশ্বাসযোগ্য, তা দিয়েই শুরু করুন। কারণ তা বাস্তব। একটি সশস্ত্র যুদ্ধ অনির্দিষ্টকালের জন্য চালিয়ে না গিয়ে বরং তার অবসান ঘটানো এবং আলোচনার মাধ্যমে সক্রিয় সংঘাত বন্ধ করার ব্যাপারে প্রেসিডেন্টের প্রচারণা মোটেও তুচ্ছ বিষয় নয়। যেমন– হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেবে, নৌ-অবরোধ তুলে নেবে এবং সব পক্ষ বোমাবর্ষণ বন্ধ করবে। বিজয়ের মাধ্যমে নয়, বরং ক্লান্তির কারণেও যুদ্ধ শেষ হয়। তা ছাড়া এই সমঝোতা স্মারকের বিকল্প হিসেবে টেবিলে আরও ভালো কোনো চুক্তি ছিল না; বরং এটি ছিল উন্মুক্ত এক সামরিক দায়বদ্ধতা, যা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো সুস্পষ্ট পথ ছিল না।
যেখানে কৃতিত্ব দেওয়া দরকার, সেখানে কৃতিত্ব দিতেই হবে। কূটনীতি ব্যর্থ হলে এই প্রশাসন শক্তি প্রয়োগ করতে প্রস্তুত ছিল এবং শক্তি প্রয়োগের পর আলোচনার পথ বেছে নিতেও ইচ্ছুক ছিল। এই ক্রমবিন্যাস– প্রথমে সামরিক চাপ, পরে কূটনীতি– ঠিক সেই তত্ত্ব, যা এই প্রেসিডেন্ট সবসময় করে এসেছেন এবং নিজস্ব মানদণ্ডে তা অযৌক্তিক নয়।

কিন্তু এই বিজয়ের একটি সুস্পষ্ট সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তা হলো, ইসরায়েলকে ছাড়াই এই যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। আলোচনাটি ওয়াশিংটন, পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারী, জেনেভা এবং ভার্সাইয়ের মাধ্যমে হয়েছে। এতে মনে হচ্ছে, ইসরায়েল ছাড়া সবখানেই আলাপ জারি ছিল। অথচ এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের এক নম্বর মিত্র ইসরায়েল। 

যে মিত্র এই যুদ্ধের সূচনাকারী, যাকে ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য টেকা কঠিন, তাকে ছাড়া টেকসই চুক্তি করা যায় না; বরং এতে জটিলতাও বাড়বে। 
সম্পদ অবমুক্তকরণের বিষয়টি ‘আলোচনার অগ্রগতির আলোকে’ বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা এতটাই নমনীয় যে এর অর্থ প্রায় যে কোনো কিছুই হতে পারে। অথচ যাচাইকরণের বিষয়টি একটি ‘চূড়ান্ত চুক্তি’ পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা পেতে এখনও ৬০ দিন বাকি; তা ছাড়া পারস্পরিক সম্মতিতে যার মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে। প্রথমে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করা হয়, আর তার প্রমাণ মেলে অনেক পরে। চার দশক ধরে তেহরানের সঙ্গে কাজ করেছেন এমন যে কোনো আলোচকই আপনাকে বলে দিতে পারবেন যে এই ক্রমবিন্যাসের কোন অংশটিকে ইরান বাধ্যতামূলক এবং কোন অংশটিকে আকাঙ্ক্ষিত হিসেবে গণ্য করবে।

এরপর রয়েছে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল। এটি এমন একটি অঙ্ক, যা অন্য কোনো প্রেক্ষাপটে এই হোয়াইট হাউসের কাছ থেকে অকল্পনীয়। এর সপক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়, ওয়াশিংটন নিজে এর চেক লিখবে না। বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে এই পার্থক্য টিকবে না। যে প্রশাসন ইরানের শাসন ব্যবস্থাকে নগদ অর্থে ভাসিয়ে দেওয়ার বিপদকে কেন্দ্র করে ওবামা আমলের চুক্তির সমালোচনা করেছিল, তারাই এখন নিজেদের আরও বড় এক বন্যার স্থপতি হিসেবে দেখতে পাচ্ছে। এর পরিণতি ভোগ করতে গিয়ে ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া এখনই আঁচ করা যায়।
আগাম নিষেধাজ্ঞা শিথিলতার আশ্বাসে দেওয়া অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতিগুলো শেষ পর্যন্ত কী রূপ নেবে কেউ জানে না, যদিও ইরানি শাসকদের জন্য এটি একটি উপহারস্বরূপ। মার্কিন জনগণ কীভাবে এ চুক্তিকে গ্রহণ করবে তাও দেখার বিষয়। 

অ্যাডলফো ফ্রাঙ্কো: রিপাবলিকান পার্টির কৌশলবিদ, পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০১৬ ও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণার সাবেক প্রতিনিধি; আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম 

আরও পড়ুন

×