সমকালীন প্রসঙ্গ
গাছ লাগাতে হলে আগে গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে
ফরিদা আখতার
ফরিদা আখতার
প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ | ০৭:২৫ | আপডেট: ২১ জুন ২০২৬ | ১১:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিএনপি সরকার ঘোষণা করেছে ‘আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণ করা হবে।’ পরিবেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই গাছ লাগানো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বন, বন্যপ্রাণী, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ‘ন্যাশনাল গ্রিন মিশন’ নামে পাঁচ দফা পরিকল্পনার অংশ।
গাছ লাগানোর অগ্রাধিকারের সময় বহু আগেই পার হয়ে গেছে। এখন আমরা পরিবেশ ও জলবায়ু বিপর্যয়ের এক কঠিন সময়ে আছি, যখন তাপমাত্রা বাড়ছে, বৃষ্টির নিয়ম ঠিক থাকছে না, মৌসুম মানছে না, মাটি ফেটে যাচ্ছে, লবণাক্ততায় তিক্ত হয়ে গেছে উপকূল। মানুষের দুর্দশার শেষ নেই। এই পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার এই কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তার আগে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রয়েছে; কোনো প্রকার অনুমোদন ছাড়া দেশে আর একটি গাছও কাটা যাবে না, এমন ঘোষণা। গাছ কাটা অব্যাহত রেখে ২৫ কেন ৫০ কোটি গাছ লাগালেও কোনো ফল পাওয়া যাবে না।
গাছ লাগানোর এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য যদি হয় প্রাণীর অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ানো, তাহলে যে গাছ ইতোমধ্যে অক্সিজেন দিয়ে মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছে, তা রক্ষার ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে? নতুন লাগানো গাছ পরদিন থেকে অক্সিজেন দেওয়া শুরু করলেও তার পরিমাণ ইতোমধ্যে বড় হয়ে যাওয়া গাছের চেয়ে নিশ্চয়ই বেশি হবে না।
মানুষ বাতাস থেকে অক্সিজেন নেয় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে। আমরা হয়তো মনেও রাখি না, গাছ যদি কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ না করত আর অক্সিজেন না দিত তাহলে অক্সিজেন ছাড়া মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকাই অসম্ভব হতো। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ বছরে হাজার হাজার লিটার অক্সিজেন ছাড়ে; তবে সব গাছ একই পরিমাণ অক্সিজেন ছাড়বে এমন নয়। গাছের ধরন ও প্রজাতির ওপর অক্সিজেনের ছাড়া এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণের পরিমাণ নির্ভর করে। এত হিসাব সবার জন্য সম্ভব নয়; তাই সহজ উপায় হচ্ছে সকল ধরনের ও প্রজাতির গাছ লাগানো।
গাছ লাগানোর কথা শুনলে আমরা খুশি হই, কিন্তু প্রথম কাজ হওয়া উচিত পূর্ণবয়স্ক গাছ কাটা বন্ধ করা। নতুন করে লাগানো গাছ পূর্ণবয়স্ক হতে কত সময় লাগবে, তাও নির্ভর করে প্রজাতির ওপর। আমরা জানি না, সরকারের গাছ লাগানো পরিকল্পনার মধ্যে কী কী প্রজাতির গাছ আছে; সেটি প্রকাশ করলে জনগণের উপকার হতো।
অতএব জরুরি ভিত্তিতে গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে। ইংরেজিতে বলা হয় ‘ইয়েস্টারডে’। অর্থাৎ গাছ কাটা বন্ধের ঘোষণা দিতে হবে আজ নয়, আগামীকাল নয়, গতকাল। অর্থাৎ জরুরি ভিত্তিতে গাছ কাটা বন্ধ করার সময়ও আমাদের পার হয়ে গেছে।
যেসব ক্ষেত্রে গাছ কাটা বন্ধ করা খুব জরুরি, তার দুটি উদাহরণ দিচ্ছি: ১. ইটভাটায় ইট পোড়ানোর কাজে জ্বালানি হিসেবে কাঠ বা গাছ ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও বেআইনি ব্যবহার হচ্ছে। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ (২০১৯ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী, ইটের ভাটায় জ্বালানি কাঠ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে প্রায়ই দেখা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইটভাটায় কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। সারাদেশের ইটের ভাটার জন্য প্রতিদিন কত হাজার বা লাখ গাছ কাটা যাচ্ছে তার খবর কেউ রাখছে না।

২. তামাক চাষে তামাক পাতা পোড়াতে লাকড়ির ব্যবহার করা হয়। রংপুর, কুষ্টিয়া, পার্বত্য চট্টগ্রাম যেখানেই তামাক চাষ হচ্ছে, সেখানে গাছ কেটে সাফ করে তামাক কোম্পানি দ্রুত বর্ধনশীল গাছ লাগিয়ে চোখে ধুলা দেওয়ার চেষ্টা করছে। উবিনীগ থেকে একটি গবেষণায় আমরা দেখেছি, তামাক চাষের এলাকায় তন্দুর বা ভাটিঘরের সামনে স্তূপ করা কাটা গাছ সারাবছর জমতে থাকে। তামাক চাষিরা জানিয়েছেন, জ্বালানির জন্য এমন কোনো গাছ নেই, যা ভাটিঘর থেকে রক্ষা পেয়েছে। বান্দরবানে তামাক চাষিরা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেছেন গর্জন, সেগুন, গামারি, জাম, কড়ই, আম, কাঁঠাল প্রভৃতি। কুষ্টিয়াতে তামাক পোড়ানোর জন্য বিভিন্ন প্রজাতির পুরোনো গাছ কাটা হয়ে গেছে। এখন লাকড়ির অভাবে তামাক পাতা পোড়ানো হচ্ছে খড়বিচালি, পাটকাঠি, ধইঞ্চা, আখের ছোবড়া দিয়ে।
গবেষণায় দেখানো হয়েছে, একটি তন্দুর বা ভাটির জন্য এক মৌসুমে ২৪০ মণ জ্বালানি কাঠের প্রয়োজন হয়। এই কাঠ পেতে হলে মাঝারি সাইজের এক হাজার থেকে ১২শ গাছ কাটতে হয়।
আরও অনেক উদাহরণ আছে। যেমন–মহাসড়ক নির্মাণ, বাড়িঘর নির্মাণকাজের জন্য অনেক গাছ কাটা হয়। যমুনা সেতু করার জন্য ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলের পুরো পথে অসংখ্য কাটা গাছ নিজের চোখে দেখেছি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে গাছ না কেটে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়ক প্রশস্তকরণের নির্দেশ দিয়েছেন এপ্রিল মাসে। এতে রক্ষা পেয়েছে তিন হাজারেরও বেশি গাছ। শুধু বিদ্যমান গাছ রক্ষা নয়, পুরো মেরিন ড্রাইভকে আরও নান্দনিক ও পরিবেশবান্ধব করতে সড়কের দুই পাশে নতুন গাছ লাগানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
আরও একটি জরুরি কাজ হচ্ছে, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর গাছ চিহ্নিত করে কেটে ফেলাও দরকার। ইউক্যালিপটাস, আকাশমণি, মেহগনিসহ গাছ কাটার নিয়ম মেনে কেটে ফেলাও পরিবেশ রক্ষার জন্য জরুরি। অর্থাৎ এ কথা মনে রাখতে হবে গাছ লাগানো মানেই পরিবেশ রক্ষা নয়। পরিবেশবিজ্ঞানে পরিবেশ ধ্বংসকারী গাছও আছে।
শেষ করব কেনিয়ার ওয়াঙ্গারি মাথাইয়ের গ্রিনবেল্ট মুভমেন্টের কথা বলে। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল–বন উজাড় রোধ ও গাছ লাগানো। ওয়াঙ্গারি মাথাইয়ের নেতৃত্বে কেনিয়াজুড়ে লাখো মানুষ, বিশেষ করে নারীরা, গাছ লাগানোর কাজে যুক্ত হন। ১৯৭৭ সালে এই গাছ লাগানো শুরু হয় এবং প্রায় তিন কোটি গাছ লাগিয়ে এবং আন্দোলন সারা আফ্রিকায় ছড়িয়ে বন উজাড় রোধ, মাটির ক্ষয় কমানো এবং পরিবেশ রক্ষায় অবদানের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কারও লাভ করেন। এখন গ্রিন বেল্ট মুভমেন্টের মাধ্যমে এই পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কোটি ১০ লাখ গাছ লাগানো হয়েছে।
দেশের ২৫ কোটি গাছ লাগানো পরিকল্পনা দেরিতে হলেও খুবই জরুরি একটি প্রকল্প। এর সার্বিক সফলতা কামনা করি। কিন্তু বিদ্যমান গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে তার আগে।
ফরিদা আখতার: অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং উবিনীগ-এর নির্বাহী পরিচালক
- বিষয় :
- ফরিদা আখতার
