ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনে বিলম্ব কেন

সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনে বিলম্ব কেন
×

আবু তাহের খান 

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ২০:১৪

সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদের অধিবেশন যদি আইন–নীতি প্রণয়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনাসঙক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রস্থল হয়, তাহলে এর সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো হচ্ছে সেসব ব্যাপারে চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংসদের আলোচনাকে গাইড করার হাতিয়ার। খাতওয়ারি কার্যক্রমের বিবেচনায় এই সংসদীয় কমিটিগুলোর মধ্যে, আবার, অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। কারণ এ কমিটিগুলোর মাধ্যমেই বস্তুত মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্ট আইন, নীতি ও অন্য বিধিবিধান জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হয়।

সংশ্লিস্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডের ওপর সংসদের নজরদারিও এর মাধ্যমেই কার্যকর থাকে। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বয়স ইতোমধ্যে তিন মাস পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠিত হয়নি। ১২ মার্চ প্রকাশিত সমকালের খবর অনুসারে, সংসদের প্রথম দিনের বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ যাচাইয়ে বিশেষ কমিটি ও কার্য উপদেষ্টা কমিটিসহ পাঁচটি কমিটি গঠন করা হয়, যেগুলোর মধ্যে মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত কোনো কমিটি নেই। এর ফলে এ সময়ে আইন পাশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অভিমত ও পর্যবেক্ষণ নেওয়ার রীতিই ভঙ্গ হয়নি, আইনগুলোর মধ্যে খামতি থাকারও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। 

যেমন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারী করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে কোনগুলো জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হবে এবং কোনটি হবে না, তা নির্ধারণ করেছে সংসদের একটি বিশেষ কমিটির। অথচ সংসদীয় রীতি-পদ্ধতি অনুযায়ী কাজটি হওয়া উচিত ছিল স্ব স্ব মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে। তা না হওয়ায় পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা ছাড়াই বিশেষ কমিটির দায়সারা সুপারিশের ভিত্তিতে এগুলো সংসদে উপস্থাপিত হয়েছে।
 দোষটা, নিঃসন্দেহে, ওই বিশেষ কমিটির নয়। সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটি বা, প্রকৃত অর্থে, সরকারি দলের সিদ্ধান্তই তারা পালন করেছেন।  আর এরূপ চাপিয়ে দেওয়া কাজের ফলাফল হচ্ছে, কোনো পরিবর্তন-পরিমার্জন ছাড়াই ৯৭টি অধ্যাদেশ হুবহু আগের আদলে পাস হয়ে গেছে এবং মাত্র ১৩টি অধ্যাদেশে যৎসামান্য পরিবর্তন এনে পাস করা হয়েছে। বিশেষত এ অতি দুর্বল আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া ও পদ্ধতির কারণে এ সংসদের প্রথম অধিবেশনের কার্যক্রমের গুণগত মান নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন থেকে যাবে। 
অবশ্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, এগুলো কোন পদ্ধতিতে গঠিত হবে তা এখনও ঠিক হয়নি। অতীতের পদ্ধতিগুলো হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে কমিটির সভাপতি করা বা মন্ত্রীবহির্ভূত সরকারদলীয় কোনো সদস্যকে সভাপতি করা বা বিরোধী দলের কোনো সদস্যকে সভাপতি করা। বর্তমান সরকার কোনটি করবে, তা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়; যেখানে সরকার সম্ভবত বিরোধী দলেরও সায় চাচ্ছে। সরকার বলেছে, তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অঙ্গিকারাবদ্ধ, যেখানে সরকারি আয়ব্যয়সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির মতো বিশেষ কিছু সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান বা সভাপ্রধানের পদ বিরোধী দল থেকে বানানোর নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু জুলাই সনদ, গণভোট ইত্যাদি নিয়ে দুপক্ষের অবস্থান প্রায় বিপরীতমুখী। সম্ভবত এ কারণে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের কাজ এখনও ঝুলে আছে।

বাংলাদেশ যে ওয়েস্টমিনস্টার রীতিকে আদর্শ মেনে ১৯৭২ সালে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় যাত্রা শুরু করেছিল এবং ১৯৯০ সালে তিন জোটের রূপরেখার মাধ্যমে আরও একবার সে ব্যবস্থাকে নিশ্চিত করেছে, সে ধাঁচের আওতায় প্রথম অদিবেশনেই সংসদীয় কমিটগুলো গঠিত হওয়াটাই রীতি। তা না হলে অধিবেশনে সরকার ও বিরোধী পক্ষের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিতর্ক সংসদের কার্যকরতা প্রমাণ করে না। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো সক্রিয় ও সতেজ না থাকলে যে কোনো সংসদকেই অর্ধেক কার্যকর বলা যাবে।

আশা করি, স্থায়ী কমিটিগুলো আগামী অধিবেশনেই গঠিত হবে। ইতোমধ্যে পাসকৃত আইনগুলোর ভিত্তিতে সামনে যেসব বিধিবিধান প্রণীত হবে, সেখানে যেন আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকেই যতটা সম্ভব ঘটে যাওয়া ভ্রান্তিগুলোর ক্ষতিপূরণের চেষ্টা থাকে। যেগুলোর ক্ষেত্রে তা সম্ভব হবে না, সেগুলো যত দ্রুত সম্ভব পর্যালোচনা করে সংশোধিত বা পুনঃসংশোধিত আকারে সংসদীয় কমিটির পরামর্শ ও মতামতের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদে বিল আকারে উপস্থাপন করা যেতে পারে। 

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গত ৫৫ বছরের বয়সকালের মধ্যে নানা হতাশা, বাধাবিপত্তি ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আশার কথা, এর প্রায় ৩০ বছরই কেটেছে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার আওতায় এবং ধারণা করা যায়, এখন পর্যন্ত সময়ের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সরকার ব্যবস্থা হিসেবে মানুষ এটিকেই বেছে নিয়েছে–এর কিছু দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও। কিন্তু কষ্ট ও হতাশার বিষয়, দীর্ঘ ৩০ বছর সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চর্চা করার পরও এ ব্যবস্থার মূল চেতনাকে এ দেশের সরকার ও জাতীয় সংসদ মোটেও যথাযথভাবে ধারণ করতে পারেনি। এখন পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ও এর সদস্যরা স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধির মতোই আচরণ করছেন। সংসদ অধিবেশনের অধিকাংশ সময় তারা নিজ এলাকার বাজারঘাটের ইজারা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে নিজের থাকা না-থাকা, মসজিদ-মাদ্রাসা-এতিমখানার জন্য বরাদ্দ দাবি করা ইত্যাদি নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। সংসদ সদস্য হিসেবে তাদের কাজ যে আইন ও নীতি প্রণয়ন, সেটি প্রায়ই তারা ভুলে যান বা সে বিষয়ে তাদের তেমন কোনো আগ্রহ দেখা যায় না। 

একইভাবে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোই যে আসলে সংসদ ও সরকারের মূল চালিকাশক্তি, সেটিও প্রায়ই সরকার ও সংসদ নেতৃত্বের ভাবনায় আসে না। সংসদ অধিবেশনে থাকলেই যে কেবল সংসদীয় কমিটির কার্যক্রম সচল থাকবে, এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। কমিটিগুলো নিয়মিত বৈঠকে মিলিত হলে নতুন সংসদ সদস্যরাও সংসদের রীতিনীতি ও কার্যক্রম সম্পর্কে সহজে ওয়াকেবহাল হতে পারেন। এ কারণেও জাতীয় সংসদ গঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ গঠন করা যেমন জরুরি, তেমনি সংসদ গঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো গঠিত হওয়াটাও সমান জরুরি। কমিটিগুলো অবিলম্বে গঠিত হোক;  আর কমিটি-সভাপতিরও উচিত কমিটি গঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর কার্যক্রম শুরু করে দেওয়া এবং সময়ের দিক থেকে যে কমিটিগুলো তিন-চার মাস পিছিয়ে পড়ল, সেটিকে বর্ধিত কাজ ও পরিশ্রমের মাধ্যমে পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা।

আবু তাহের খান: অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি; সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়।:

আরও পড়ুন

×