মাধ্যমিক পরীক্ষা
শিক্ষার্থীদের স্বার্থে ধাপে ধাপে এগিয়ে আসুক
সাব্বির নেওয়াজ
প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সেশনজট একটি দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। করোনা মহামারি, কারিকুলামের পরিবর্তন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতায় গত কয়েক বছরে এই সংকট আরও গভীর হয়েছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে সরকার ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা জানুয়ারির শুরুতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এর লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষাবর্ষকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা, সেশনজট কমানো এবং শিক্ষার্থীদের ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ নিশ্চিত করা। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত ঘিরে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা অবহেলার সুযোগ নেই।
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, বর্তমানে এসএসসি ও এইচএসসি সম্পন্ন করতে শিক্ষার্থীদের বয়স ২০ বছর পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে জাতি কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের সময় হারাচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনা হলো, ধাপে ধাপে ডিসেম্বরকে পরীক্ষার আদর্শ সময় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, যাতে শিক্ষাবর্ষ ও পরীক্ষা একই ছন্দে পরিচালিত হয়। এই যুক্তি অমূলক নয়। উন্নত শিক্ষাব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সময়সূচি বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘসূত্রতা শিক্ষার্থীদের মানসিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়। সেশনজট কমানো এবং সময়মতো পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দ্রুত উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিবর্তনের জন্য দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবিক অর্থে প্রস্তুত কিনা।
বাস্তবতা হলো, যে শিক্ষার্থীদের ওপর এই সিদ্ধান্তের প্রথম প্রভাব পড়বে, তারা বছরের শুরুতে সময়মতো বই পায়নি। মার্চ মাস পর্যন্ত অনেক শিক্ষার্থী পূর্ণাঙ্গ বই হাতে পায়নি। এরপর রমজানের ছুটি, ঈদের ছুটি, এসএসসি পরীক্ষার কারণে নিয়মিত ক্লাস বন্ধ থাকা– সব মিলিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কার্যত বিঘ্নিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ তিন মাস আগে পরীক্ষা নির্ধারণ করা অনেক শিক্ষার্থীর জন্য মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের উদ্বেগ অমূলক নয়। তারা মার্চ-এপ্রিল সামনে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এখন জানুয়ারিতে পরীক্ষা দিতে হলে একই সিলেবাস কম সময়ে শেষ করতে হবে। শহরের তুলনায় গ্রামীণ ও প্রান্তিক শিক্ষার্থীরা এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ তাদের অনেকের কাছে কোচিং, প্রযুক্তি বা বিকল্প সহায়তার সুযোগ সীমিত। ফলে শিক্ষা বৈষম্য আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হলে সেটি হতে হবে গবেষণাভিত্তিক, ধীর ও অংশগ্রহণমূলক। গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী যথার্থই প্রশ্ন তুলেছেন– তৃণমূলের বাস্তবতা যাচাই ছাড়া শুধু অনলাইনে আলোচনা করে কি এমন বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়? সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শেখার ঘাটতি, শ্রেণিকক্ষের উপস্থিতি, পাঠদানের কার্যকারিতা ও শিক্ষক সংকটের মতো বিষয় গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন ছিল।
শিক্ষকদের আশঙ্কাও অমূলক নয়। যখন ক্লাসের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হয়নি, তখন পরীক্ষা এগিয়ে আনা শিক্ষার্থীদের কোচিংনির্ভর করে তুলতে পারে। অর্থাৎ সেশনজট কমানোর যে লক্ষ্য, তা বাস্তবে নতুন আর্থিক ও মানসিক চাপের জন্ম দিতে পারে। শিক্ষা তখন আরও বেশি বাণিজ্যিকীকরণের দিকে ধাবিত হবে।
তবে এ কথাও সত্য, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সাহসী সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। বছরের পর বছর পরীক্ষা পেছাতে থাকলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অলসতা, অনিশ্চয়তা ও সময়ের অপচয় বাড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিনুর রশীদের বক্তব্য তাই গুরুত্বের দাবি রাখে। তিনি বলেছেন, সময়মতো পরীক্ষা নেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। কিন্তু এর সঙ্গে সমানতালে নিশ্চিত করতে হবে ‘লার্নিং’ বা প্রকৃত শিখন। শুধু পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনলেই হবে না; স্কুলে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষকদের জবাবদিহি, মানসম্মত ক্লাস ও শিক্ষার্থীদের মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষা কেবল পরীক্ষা নয়। এটি সামগ্রিক মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের প্রক্রিয়া। শিক্ষার্থীরা যেন আতঙ্ক নিয়ে নয়, আত্মবিশ্বাস নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে; সেই পরিবেশ তৈরি করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই সরকার যদি সত্যিই ডিসেম্বরভিত্তিক পরীক্ষা পদ্ধতিতে যেতে চায়, তাহলে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করাই হবে যুক্তিযুক্ত। এক বছরে হঠাৎ তিন মাস এগিয়ে আনার পরিবর্তে প্রতিবছর এক মাস এগিয়ে আনলে শিক্ষার্থীরা মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেত।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়োপযোগী ও গতিশীল করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ, শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা এবং সামাজিক বৈষম্যের বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পেতে হবে।
সাব্বির নেওয়াজ: বিশেষ প্রতিনিধি, সমকাল
[email protected]
- বিষয় :
- পরীক্ষা
