ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

সংস্কৃতি

পৃথিবীর কোথায় চলচ্চিত্র প্রদর্শন নিষিদ্ধ হয়?

পৃথিবীর কোথায় চলচ্চিত্র প্রদর্শন নিষিদ্ধ হয়?
×

মামুনুর রশীদ

মামুনুর রশীদ

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৭:৫৩ | আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬ | ১১:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

একদা শিল্প-সংস্কৃতির পাদপীঠ ব্রাহ্মণবাড়িয়া নানাভাবে উগ্রবাদীদের দ্বারা আক্রান্ত। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। সত্তর, আশি এবং নব্বই দশকজুড়েই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নানা ধরনের সাংস্কৃতিক উৎসব হয়েছে। সাহিত্য সম্মেলন, নাট্য উৎসব, নাট্য কর্মশালা, সাহিত্যবিষয়ক সেমিনার, সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশনায় মুখরিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া। স্থানীয় মিলনায়তনে নিয়মিত নাট্য মঞ্চায়ন 
হতো। পাঁচটি সিনেমা হলে প্রতিদিন প্রচুর দর্শক সমাগম হতো। 

বেশ কয়েকবার ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, কবি আল মাহমুদ, আসাদ চৌধুরী এবং আরও অনেক খ্যাতিমান শিল্পী-সাহিত্যিকের সঙ্গে আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। ভোরের ট্রেনে চড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যাতায়াত করেছি। স্কুল-কলেজের শিক্ষক-ছাত্রদের অংশগ্রহণ দেখেছি ব্যাপক। স্থানীয় লেখক, বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীর বিপুল সমাগম হয়েছিল। উপমহাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ এবং তাদের বংশধরদের আনাগোনায় মুখরিত ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিল্প-সংস্কৃতি। 

হঠাৎ দেখতে পেলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া নামের বদলে অনেকে বিবাড়িয়া লিখতে ইচ্ছুক। যেহেতু ব্রাহ্মণবাড়িয়া বানান একটু কঠিন; তাই ভেবেছিলাম, এটি হয়তো সহজীকরণের একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু যখন দেখা গেল সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, সাংস্কৃতিক আয়োজন কমে যাচ্ছে, তখন বিষয়টি আর বুঝতে বাকি থাকল না– নাম সংক্ষিপ্তকরণ আসলে সুদূরপ্রসারী চক্রান্তের অংশ। 

সর্বশেষ কিছু প্রগতিশীল তরুণ, যারা ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন করে আসছিল, তারা সম্প্রতি ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নামে একটি চলচ্চিত্রকে বিদ্যালয়ের একটি ক্লাসরুমে দেখানোর ব্যবস্থা করেছে। এই ফিল্ম সোসাইটির সদস্য প্রায়ই চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে থাকে এই ক্লাসরুম থেকে। এবার হঠাৎ যেন ওই উগ্রবাদী রক্ষকদের টনক নড়ে উঠল। হায় হায়! গেল গেল! সব গেল! তাই তারা সিনেমাটি বন্ধ করার জন্য উঠেপড়ে লাগল। 

চলচ্চিত্রটি এখনও ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সগৌরবে চলছে। বিদেশেও চলচ্চিত্রটি সুনাম অর্জন করেছে। এখন কি ধরে নিতে হবে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া দেশের বাইরের একটি জেলা অথবা রাষ্ট্রের আইনের প্রতি তাদের ন্যূনতম শ্রদ্ধা-ভক্তি নেই? সংস্কৃতিচর্চার অধিকার আমাদের রাষ্ট্রীয় সংবিধানে স্বীকৃত। অথচ মুষ্টিমেয় লোকের উস্কানিতে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটানো যেতে পারে না। জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সংসদ সদস্যদের দায়িত্বই হচ্ছে সংবিধান যাতে সব সময় কার্যকর থাকে তার দিকে সুদৃষ্টি রাখা। 

আমাদের সংস্কৃতির লড়াই দীর্ঘদিনের। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন চলেছে। স্বাধিকার আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন একই খাতে প্রবাহিত হওয়ায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। সেই সময়কার গৌরবোজ্জ্বল কর্মকাণ্ডে বাঙালির সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ড গড়ে উঠেছে। আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাসও গৌরবোজ্জ্বল। 

হিন্দি ছায়াছবি, লাহোরের উর্দু সিনেমা ও হলিউডের সিনেমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের বাংলা ছায়াছবি মুখ ও মুখোশ, মাটির পাহাড়, অনেক দিনের চেনা, কখনো আসেনি, কাঁচের দেয়াল, জীবন থেকে নেয়া প্রভৃতি ইতিহাস তৈরি করেছে। এ সময়ে দেশে নতুন নতুন সিনেমা হল তৈরি হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশেও অনেক নতুন সিনেমা হল প্রেক্ষাগৃহের ইতিহাসে সংযোজিত হয়েছে। অনেক ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে এটি ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। 

আশির দশকে এসে কিছু লোভী ও নীতিহীন চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীর হাতে চলচ্চিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আবার তা উঠে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু সিনেমা হল বন্ধও হয়েছে। একই সঙ্গে সচেতন দর্শক শ্রেণি গড়ে উঠেছে। দেশ-বিদেশের নানা চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ এখন টেলিভিশনের মাধ্যমে অবারিত। রয়েছে বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম। 

দুই দশক ধরে অত্যন্ত রুচিবান কিছু পরিচালক সুস্থ চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য একটা লড়াইয়ে নেমেছেন। যার ফলে আমরা বেশ কিছু ভালো চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ পেয়েছি। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎসবে চলচ্চিত্রগুলো সম্মানিত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এসব চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য পর্যাপ্ত প্রেক্ষাগৃহের ব্যবস্থা নেই। হাতেগোনা কিছু সিনেপ্লেক্সই এখন ভরসা। 
মনে রাখা জরুরি, চলচ্চিত্র একটি লগ্নিনির্ভর ব্যবসা। লগ্নিকারকরা সংগত কারণেই পুঁজি ফেরত পাওয়ার আশা করেন। একসময় রাজধানীর বিজয়নগর, কাকরাইল এলাকায় প্রচুর প্রযোজনা-পরিবেশনা এবং প্রেক্ষাগৃহভিত্তিক প্রডাকশন হাউস ছিল। প্রেক্ষাগৃহের মালিকরা চলচ্চিত্র নির্মাণের সূচনা থেকেই আগাম পুঁজি বিনিয়োগ করতেন। নতুন চলচ্চিত্র মানেই 
ছিল উৎসব। 

চলচ্চিত্র আমাদের পারিবারিক জীবন থেকে রাষ্ট্রের উপরিকাঠামো পর্যন্ত বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে রাখে। ঘরে ঘরে মানুষের আচার-আচরণ, ফ্যাশন, গৃহচর্চায় সর্বত্র প্রভাবশালী। একটি সহনশীল উচ্চপীঠ জীবন গঠনে চলচ্চিত্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ভায়োলেন্স ও যৌনতা এসে এর অঙ্গহানি মাঝে মাঝে করে বটে, তা সমাজ বেশি দিন গ্রহণ করে না। যে কারণে আশির দশকের কাটপিস চলচ্চিত্র নিঃশেষিত হয়ে গেছে। 

পৃথিবীর অনেক দেশেই বিশেষত দক্ষিণ কোরিয়ায় রীতিমতো আইন করা হয়েছে, কোনো বড় স্থাপনায় অবশ্যই সিনেপ্লেক্স থাকতে হবে। তার জন্য ভবন নির্মাতাকে নির্দিষ্ট বাজেটও রাখতে হয়। ফলে দেশটিতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণও সম্ভব হয়েছে। ইরানও অল্প বাজেটে অসাধারণ সব চলচ্চিত্র নির্মাণ করে ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। ভারতে দক্ষিণের চলচ্চিত্র ইতোমধ্যে মুম্বাইকে সব দিক থেকে অতিক্রম করে গেছে। বাংলাদেশের বেশ কিছু চলচ্চিত্রের মধ্যে এখন সেই সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। 
সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রটি অসাধারণ প্রতিশ্রুতিশীল। এই পরিচালকের আগের ছবি ‘উৎসব’ও রুচিশীল বিনোদন এবং দর্শকনন্দিত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, চলচ্চিত্রের এই প্রবাহ রুদ্ধ করার বিনিময়ে সংস্কৃতিবিরোধী চক্র কী উপহার দিতে পেরেছে? মাদক, ধর্মান্ধতা, দুর্নীতি, ভায়োলেন্স, মব সহিংসতা, অশিক্ষা, অনাচার– এসব। পৃথিবীর কোথায় চলচ্চিত্র প্রদর্শন নিষিদ্ধ হয়? বনলতা এক্সপ্রেসকে চলতে দিতে হবে। 

শুধু চলচ্চিত্র নয়; উগ্রবাদীরা নাটক, সংগীত, নৃত্যকলা, চারুশিল্পসহ সকল প্রকার সুকুমার শিল্প বন্ধ করতে চায়। আজকের দিনে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও এসব শিল্পের চর্চা শুরু হয়েছে। সৌদি আরবেও চলচ্চিত্র অনেক দূর এগিয়ে গেছে। সরকার সেখানে বিপুল পরিমাণ অর্থ লগ্নি করছে এবং চলচ্চিত্রকারদের অনুদান দিয়ে, বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ করিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের সুযোগ সৃষ্টি করছে। 

বুঝলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কতিপয় উগ্রবাদী চলচ্চিত্র প্রদর্শন বন্ধ করেছে। কিন্তু তারা কি আকাশপথে আসা ইউটিউবে বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মেও চলচ্চিত্র বা ওটিটি বন্ধ করতে পারবে? আমাদের জনগণ সুস্থ সংস্কৃতিচর্চা চায়। এখানে বাধার সৃষ্টি করলে তার ফল শুভ হবে না। তাই আশা করি, এলাকার সচেতন মানুষ, রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং জনসেবায় দায়বদ্ধ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সম্মিলিতভাবে এই প্রবণতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন এবং সুস্থ সংস্কৃতি বিনির্মাণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবেন।

এইটুকু অনুরোধও করে রাখছি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পাঁচটি সিনেমা হল আবার একযোগে চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। শিল্প-সাহিত্যের পাদপীঠ ব্রাহ্মণবাড়িয়া অন্ধকার থেকে জেগে উঠুক এবং তার হৃতগৌরব ফিরে পাক। জয় হোক সংস্কৃতির।

মামুনুর রশীদ: নাট্যকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

আরও পড়ুন

×