ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

সমতা

জেন্ডার বাজেট: প্রতিশ্রুতির তুলনায় বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে?

জেন্ডার বাজেট: প্রতিশ্রুতির তুলনায় বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে?
×

ফারহানা হাফিজ

ফারহানা হাফিজ

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ | ০৭:২৯ | আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার, উন্নয়নের দর্শন এবং সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। একটি বাজেটের দিকে তাকিয়েই বোঝা যায়– রাষ্ট্র কার উন্নয়নকে গুরুত্ব দিচ্ছে, কার প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং কারা এখনও প্রান্তিক। বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট নিয়ে আলোচনা হলেই একটি বিষয় সামনে আসে: এটি কি নারীর ক্ষমতায়ন ও জেন্ডার সমতার জন্য যথেষ্ট? সেই বিবেচনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট নারীর ক্ষমতায়ন ও জেন্ডার সমতার বিষয়ে একদিকে আশাবাদের বার্তা দেয়, অন্যদিকে কিছু কঠিন প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটকে সরকার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রবৃদ্ধিমুখী বাজেট হিসেবে তুলে ধরেছে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হয়েছে এবং নারী উদ্যোক্তা, দক্ষতা উন্নয়ন ও পরিচর্যা অর্থনীতিতে নতুন কিছু উদ্যোগের ঘোষণা এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অঙ্গীকারগুলো কি নারীর জীবনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনার মতো যথেষ্ট বিনিয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত?

জেন্ডার বাজেট কী
জেন্ডার বাজেট বা জেন্ডার-সংবেদনশীল বাজেটিং হলো এমন এক বাজেট প্রক্রিয়া, যা বিশ্লেষণ করে সরকারি নীতি, কর্মসূচি ও ব্যয় নারী-পুরুষের ওপর কী ধরনের ভিন্ন প্রভাব ফেলছে এবং কীভাবে সরকারি সম্পদ ব্যবহার করে বিদ্যমান লিঙ্গ বৈষম্য কমানো যায়। এটি কোনো পৃথক নারী বাজেট নয় বা শুধু নারীদের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ও নয়। বরং বাজেটের প্রতিটি ধাপ– পরিকল্পনা, বরাদ্দ, বাস্তবায়ন এবং মূল্যায়নে জেন্ডার সমতাকে অন্তর্ভুক্ত করার একটি কৌশল।

বাংলাদেশে জেন্ডার বাজেটিংয়ের যাত্রা শুরু হয় ২০০৯-১০ অর্থবছরে মাত্র চারটি মন্ত্রণালয়কে নিয়ে। বর্তমানে এটি সম্প্রসারিত হয়ে ৬১টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে বিস্তৃত, যা দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম বৃহৎ জেন্ডার বাজেটিং উদ্যোগ। প্রতিবছর জাতীয় বাজেটের সঙ্গে একটি পৃথক জেন্ডার বাজেট রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়, যেখানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ব্যয়কে জেন্ডার-সংশ্লিষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং তা নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, সরকারি সেবায় প্রবেশাধিকার এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কল্যাণ– এই চারটি থিমের আওতায় উপস্থাপন করা হয়।

সংখ্যা বাড়ছে, অগ্রাধিকার কি কমছে?

চলতি অর্থবছরে জেন্ডার-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ২৬ হাজার ৬০ কোটি টাকায়, যা মোট বাজেটের ৩৪.৮ শতাংশ। গত বছর এই হার ছিল ৩৩.৫ শতাংশ; তার আগের বছর ৩৪.১ শতাংশ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৩৪.৪ শতাংশ। উপরিভাগে দেখলে মনে হতে পারে, জেন্ডার সমতায় সরকারি বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।

আরও গভীরে গেলে অন্য একটি বাস্তবতা সামনে আসে। জেন্ডার বরাদ্দের জিডিপি অনুপাত ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রায় ৬ শতাংশে পৌঁছেছিল। এরপর তা ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৪-২৫ সালে ৫.২ শতাংশ, ২০২৫-২৬ সালে ৪.৯ শতাংশ এবং চলতি অর্থবছরে ৪.৮ শতাংশে নেমে এসেছে। এর অর্থ হলো, অর্থনীতির আকার যত দ্রুত বাড়ছে, নারী ও মেয়েদের জন্য বিনিয়োগ তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না। বরং জাতীয় সম্পদ বণ্টনে জেন্ডার সমতার আপেক্ষিক অগ্রাধিকার কিছুটা কমছে। এ বাস্তবতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন নারী শ্রমশক্তি অংশগ্রহণে স্থবিরতা, নারীর প্রতি সহিংসতা এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি আরও জটিল আকার ধারণ করছে।

সুরক্ষায় বিনিয়োগ বনাম ক্ষমতায়নের নিশ্চয়তা
নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক অবস্থান উন্নয়নে এ বছর ৮৩ হাজার ৭৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যয় হবে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় ৪১ লাখ নারীকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিধবা ও স্বামী-নিগৃহীত ভাতা সম্প্রসারণ করে ৩০ লাখ নারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির সুবিধাভোগীর সংখ্যা প্রায় ১৯ লাখে উন্নীত করা হবে।

এসব উদ্যোগ দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ নারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা বলয় তৈরি করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সামাজিক সুরক্ষা কি নারীদের শুধু টিকে থাকার সুযোগ দিচ্ছে, নাকি তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও বাড়াচ্ছে?

দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি এখনও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভাতা ও নগদ সহায়তাকেন্দ্রিক। কিন্তু নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের জন্য প্রয়োজন উৎপাদনশীল সম্পদে প্রবেশাধিকার, দক্ষতা উন্নয়ন, বাজারে সংযোগ এবং আয়ের স্থায়ী সুযোগ সৃষ্টি।

অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা
চলতি বাজেটে নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সমতার জন্য বরাদ্দ বেড়ে ১ লাখ ৩ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ ১৪ হাজার ৭০১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার ৭১০ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে নারীবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণে বরাদ্দও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

এগুলো নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। একই সময়ে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও শোভন কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করায় বরাদ্দ ৩ হাজার ৩২১ কোটি টাকা থেকে কমে ২ হাজার ৯৭৪ কোটিতে নেমে এসেছে। এটি উদ্বেগজনক। কারণ সাম্প্রতিক শ্রমশক্তি জরিপগুলো দেখায়, নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণের হার স্থবির হয়ে আছে এবং অনেক নারী শ্রমবাজার থেকে ছিটকে পড়ছেন। বিপুলসংখ্যক নারী অনানুষ্ঠানিক খাতে কম মজুরি ও অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করছেন।

কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি বন্ধ, নিরাপদ গণপরিবহন, সাশ্রয়ী শিশুযত্ন এবং মাতৃত্বকালীন সুরক্ষায় কাঠামোগত বাধা দূর না করে শুধু নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়িয়ে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

‘শূন্য সহনশীলতা’র প্রতিফলন কোথায়?
সরকার নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’র অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করলেও এর পেছনে কী পরিমাণ বিনিয়োগ রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। ডিএনএ ল্যাব বা দ্রুত প্রতিক্রিয়া দলের মতো কিছু উদ্যোগের উল্লেখ থাকলেও সহিংসতা নির্যাতন প্রতিরোধ, বেঁচে ফেরা নারীদের জন্য সেবা, আইনি সহায়তা, নিরাপদ আশ্রয়, পুনর্বাসন ও মনোসামাজিক সহায়তার জন্য পৃথক ও দৃশ্যমান বাজেট বরাদ্দের চিত্র অনুপস্থিত।

আরও উদ্বেগজনক হলো, ডিজিটাল নির্যাতন মোকাবিলায় বরাদ্দ ২৫৭ কোটি টাকা থেকে কমে ১৬৮ কোটিতে নেমে এসেছে, যখন অনলাইন হয়রানি ও নারীবিদ্বেষী প্রচারণা বাড়ছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় ঘাটতি রয়েছে নির্যাতনের মূল কারণ মোকাবিলায়। নারীর প্রতি নির্যাতন শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক মানসিকতা ও বৈষম্যমূলক লিঙ্গ-ধারণার ফল।
তবু বাজেটে পুরুষ ও কিশোরদের সম্পৃক্ত করে সামাজিক ও আচরণগত পরিবর্তন, ইতিবাচক পুরুষত্ব, লিঙ্গসমতা শিক্ষা এবং নারীবিদ্বেষী ধারণা পরিবর্তনের জন্য কোনো উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ নেই। অথচ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু প্রতিক্রিয়ামূলক সেবা দিয়ে সহিংসতা বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক রূপান্তরমূলক বিনিয়োগ।

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেইজিং প্ল্যাটফর্ম ফর অ্যাকশন, সিডও, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (বিশেষত এসডিজি-৫) এবং নারীর প্রতি সকল প্রকার নির্যাতন নির্মূলের বিভিন্ন বৈশ্বিক অঙ্গীকারে স্বাক্ষরকারী দেশ। এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হলে নারী নির্যাতন প্রতিরোধকে শুধু একটি সামাজিক সুরক্ষা বিষয় হিসেবে নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তনের কর্মসূচি হিসেবে দেখতে হবে।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় সর্বোচ্চ বরাদ্দের জেন্ডার অগ্রাধিকার
এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কল্যাণ খাতে জেন্ডার-সংশ্লিষ্ট ব্যয় বেড়ে ১ লাখ ৪ হাজার ৮০৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই ইতিবাচক চিত্রের মধ্যেও একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা রয়েছে। শিক্ষা খাতে জেন্ডার-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দের অনুপাত ৫৪.৫ শতাংশ থেকে কমে ৫১.১ শতাংশে নেমেছে এবং স্বাস্থ্য খাতে তা ৪৬.৫ শতাংশ থেকে কমে ৪৩.৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশে কিশোরীদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় ঝরে পড়া, উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণের স্থবিরতা এবং প্রযুক্তিগত শিক্ষায় নারীদের কম অংশগ্রহণ এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। একইভাবে কিশোরী স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, অসংক্রামক রোগ, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী নারীদের স্বাস্থ্য চাহিদা বাজেটে খুব কম গুরুত্ব পেয়েছে।

নারীর সেবাপ্রাপ্তি ও নিরাপত্তায় অবহেলা
চারটি থিমেটিক খাতের মধ্যে সবচেয়ে কম বরাদ্দ পেয়েছে নারীর কার্যকর সরকারি সেবাপ্রাপ্তির খাত। এ খাতে বরাদ্দ কমে ৩৬ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা থেকে ৩৪ হাজার ৪৩৯ কোটিতে নেমেছে।
এটি উদ্বেগজনক, কারণ নারীর নিরাপত্তা, বিচারপ্রাপ্তি, চলাচলের স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের ভিত্তিই হলো কার্যকর সরকারি সেবা। অথচ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে এই খাতে বরাদ্দ প্রায় শূন্য বা অত্যন্ত সীমিত।

শুধু বরাদ্দ নয়, বৈষম্য নির্মূলের হাতিয়ার
বাংলাদেশের জেন্ডার বাজেটিংয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এটি এখনও অনেকাংশে ‘নারীর জন্য কত টাকা ব্যয় হলো’– এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ। অথচ জেন্ডার রেসপনসিভ বাজেটিংয়ের উদ্দেশ্য কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধি নয়; বরং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ কীভাবে লিঙ্গ বৈষম্যের মূল কারণগুলো মোকাবিলা করছে, তা নিশ্চিত করা।

বাল্যবিয়ে, পুত্রসন্তানের প্রতি পক্ষপাত, নারীর অবৈতনিক পরিচর্যা কাজের বোঝা, সম্পত্তিতে অসম প্রবেশাধিকার, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং নারীর চলাচল ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ– এসবই কাঠামোগত বৈষম্যের বহিঃপ্রকাশ। তাই জেন্ডার বাজেটের মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, এটি কি আইন, নীতি ও সামাজিক রূপান্তরমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে এসব বৈষম্যের শিকড় উৎপাটন করতে পারছে?
নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ালেও যদি নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পরিচর্যা সেবা বা সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন না আসে, তাহলে সেই বিনিয়োগের সুফল সীমিতই থাকবে। একইভাবে নারী নির্যাতন মোকাবিলায় শুধু আশ্রয়কেন্দ্র ও আইনি সহায়তা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন জেন্ডার সমতা শিক্ষা; পুরুষ ও কিশোরদের সম্পৃক্তকরণ এবং নারীবিদ্বেষী সামাজিক ধারণা পরিবর্তনে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। অতএব, জেন্ডার বাজেটের সাফল্য বরাদ্দের পরিমাণে নয়; বরং তা কতটা বৈষম্য কমাতে, নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে এবং সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে অবদান রাখছে, তার ওপর নির্ভর করবে।
সামনে কোন পথ?

বাংলাদেশের জেন্ডার বাজেটিং এখন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে কেবল বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি আর যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন বাজেটকে বৈষম্য// রূপান্তরের একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলা। জেন্ডার বাজেটের মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত– রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ কীভাবে নারী ও পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান অসম ক্ষমতার সম্পর্ক, বৈষম্যমূলক সামাজিক রীতি এবং কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতাগুলোকে পরিবর্তন করছে।

প্রথমত, নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি নির্যাতন প্রতিরোধ ও প্রতিক্রিয়ার জন্য পৃথক বাজেট কোড চালু করতে হবে এবং প্রতিক্রিয়ামূলক সেবার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক উদ্যোগে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে পুরুষ ও কিশোরদের সম্পৃক্ত করে সামাজিক ও আচরণগত পরিবর্তন, ইতিবাচক পুরুষত্ব এবং লিঙ্গসমতা বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচিতে বিনিয়োগ জরুরি।
দ্বিতীয়ত, জেন্ডার বাজেটকে ফলাফলভিত্তিক করতে হবে। শুধু কত টাকা ব্যয় হলো, তা নয়। বরং কতটা সহিংসতা কমলো, কতজন নারী নিরাপদ কর্মসংস্থানে যুক্ত হলেন বা সামাজিক মনোভাব কতটা পরিবর্তিত হলো– এসব ফলও পরিমাপ করতে হবে।

তৃতীয়ত, জেন্ডার বাজেটকে সিডও, বেইজিং প্ল্যাটফর্ম ফর অ্যাকশন, এসডিজি-৫সহ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে আরও সুস্পষ্টভাবে সংযুক্ত করতে হবে।
চতুর্থত, বয়স, দারিদ্র্য, প্রতিবন্ধিতা, ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু ঝুঁকির ভিত্তিতে তথ্য বিশ্লেষণ জোরদার করতে হবে, যাতে সবচেয়ে প্রান্তিক নারীদের প্রয়োজনগুলো দৃশ্যমান হয়।
পঞ্চমত, জেন্ডার বাজেটকে শুধু একটি বার্ষিক প্রতিবেদন নয়; বরং পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও জবাবদিহির একটি পূর্ণাঙ্গ আর্থিক শাসন ব্যবস্থায় রূপ দিতে হবে, যেখানে সংসদ, স্থানীয় সরকার, নারী সংগঠন ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণে নিয়মিত পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে।

সব শেষে, জেন্ডার বাজেটকে ‘নারীদের জন্য ব্যয়’ হিসেবে নয়; বরং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে বিদ্যমান বৈষম্যমূলক ক্ষমতা কাঠামো পরিবর্তনের একটি রূপান্তরমূলক বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। কারণ প্রকৃত জেন্ডার সমতা তখনই অর্জিত হবে, যখন বাজেট শুধু নারীর প্রয়োজন মেটাবে না; বরং বৈষম্যের শিকড় উপড়ে ফেলার ভিত্তিও তৈরি করবে।

ফারহানা হাফিজ: জেন্ডার বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×