সক্ষমতা
টেলিস্কোপ ছাড়া নভোথিয়েটার হয় কেমনে
রানা ভিক্ষু
প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ | ০৮:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
আঞ্চলিক বৈষম্যের আরেকটি দৃষ্টান্তের মুখোমুখি হচ্ছে রংপুর। প্রকল্প প্রস্তাবনায় অন্তর্ভুক্ত থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে টেলিস্কোপ বাদ দিয়ে প্রায় শেষ পর্যায়ে রংপুর নভোথিয়েটারের নির্মাণকাজ। ফলে যে প্রতিষ্ঠানটি মহাকাশবিজ্ঞান শিক্ষা, গবেষণা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার কথা ছিল, সেটি কার্যত একটি উন্নতমানের প্রদর্শনী কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে বিভাগীয় পর্যায়ে নভোথিয়েটার সম্প্রসারণের নির্দেশনা দেন। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ‘নভোথিয়েটার, রংপুর স্থাপন’ প্রকল্প অনুমোদন করে। লক্ষ্য ছিল দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহরের মতো রংপুরেও একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নভোথিয়েটার প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু শুরু থেকেই প্রকল্পটি নানা সীমাবদ্ধতা, পরিকল্পনাগত দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক জটিলতার শিকার।
প্রকল্পের প্রথম এক বছর ৯ মাসে তিনজন প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব পালন করেন, যারা সবাই ছিলেন অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। অন্যদিকে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াতেই ব্যয় হয় প্রায় ১৫ মাস। এসব কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু থেকেই গতি হারায় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।
প্রকল্পের স্থান নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রংপুর সদর উপজেলার দেবীপুর ও গঙ্গাহরি মৌজার ১০ একর নিম্নাঞ্চলীয় কৃষিজমিতে স্থাপনাটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এলাকাটি বর্ষাকালে প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় স্থানীয় জনগণ শুরুতে আপত্তি জানায়। পরে নকশা সংশোধন করে বিকল্প পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পর নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হয়। তবে স্থানীয়দের দাবি, এ অঞ্চলে মৌসুমি পরিযায়ী ও দেশীয় পাখির আবাস ও বিচরণক্ষেত্র প্রকল্পটির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত।
নির্মাণকাজের শুরুতে মহাসড়কের পাশের সরকারি গাছ কাটা এবং পরবর্তী সময়ে ঘাঘট নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ঘটনাও স্থানীয়ভাবে বিতর্ক সৃষ্টি করে। জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা হলেও এসব ঘটনার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় যুক্ত হয়েছে।
এই বাস্তবতায় প্রকল্পটি ইতোমধ্যে দুই দফায় সংশোধন করা হয়েছে। প্রথম সংশোধনীতে (২১.১১.২০২৪) প্রকল্পের মেয়াদ ১ বছর বৃদ্ধি এবং বর্ধিত ব্যয় সমন্বয়ের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় সংশোধনীতে (১৫.১২.২০২৫) প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান টেলিস্কোপকে বাদ দিয়ে প্রকল্পের মেয়াদ ১ বছর ৬ মাস বৃদ্ধি করা হয়। এখানেই সৃষ্টি হয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন; একটি নভোথিয়েটার কি টেলিস্কোপ ছাড়া পূর্ণতা পেতে পারে?
প্রকল্পের উদ্যোগী সংস্থা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের যুক্তি, টেলিস্কোপ পরিচালনায় দক্ষ জনবল সংকট রয়েছে। অন্যান্য নভোথিয়েটারের বিশেষ করে রাজশাহীর অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্লানেটরিয়াম বেশির ভাগ সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এই চ্যালেঞ্জ এড়াতে রংপুর নভোথিয়েটারের টেলিস্কোপ বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই যুক্তি বাস্তবে কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বাস্তবতা হলো, একটি আধুনিক নভোথিয়েটারের লক্ষ্য কেবল ডিজিটাল প্রদর্শনী বা সিমুলেশনভিত্তিক শিক্ষা নয়। এর অন্যতম উদ্দেশ্য মানুষকে বাস্তব আকাশ পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেওয়া। টেলিস্কোপ সেই সুযোগের প্রধান মাধ্যম। টেলিস্কোপ ছাড়া শিক্ষার্থী, গবেষক ও সাধারণ দর্শনার্থীরা জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হবে। নিয়মিত স্কাই অবজারভেশন প্রোগ্রাম, অ্যাস্ট্রোনমি ক্যাম্প, সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ পর্যবেক্ষণ এবং বিজ্ঞান ক্লাবভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রেও বড় সীমাবদ্ধতা তৈরি হবে।
টেলিস্কোপ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত দীর্ঘ মেয়াদে আরও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। প্রথমত, ভবিষ্যতে টেলিস্কোপ স্থাপনের প্রয়োজন দেখা দিলে এর ব্যয় বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি হবে। দ্বিতীয়ত, আগামী এক দশকে একটি পুরো প্রজন্ম মহাকাশবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। তৃতীয়ত, টেলিস্কোপ পরিচালনা ও গবেষণা-সংশ্লিষ্ট দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির সুযোগ হারিয়ে যাবে, যা দেশের বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য বড় ক্ষতি।
রানা ভিক্ষু: লেখক ও নীতি বিশ্লেষক
[email protected]
- বিষয় :
- মতামত
