সমকালীন প্রসঙ্গ
ইরান-মার্কিন চুক্তির বাংলাদেশ প্রেক্ষিত
সাজ্জাদ সিদ্দিকী
সাজ্জাদ সিদ্দিকী
প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ | ০৮:৩৬ | আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬ | ১৩:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকটি ১০০ দিনের বেশি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থামানোর ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক। তবে এই চুক্তির স্বাক্ষর প্রক্রিয়া এবং আঞ্চলিক সমীকরণ চুক্তির ফলপ্রসূতা নিয়ে সংশয় ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে জি৭ শীর্ষ সম্মেলন শেষে ফ্রান্সের ঐতিহাসিক ভার্সাই প্রাসাদে বসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সশরীরে কাগজে স্বাক্ষর করা, অন্যদিকে তেহরান থেকে দূরবর্তী উপায়ে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের ডিজিটাল স্বাক্ষর করার পদ্ধতিগত ভিন্নতা কেবল একটি প্রযুক্তিগত বিষয় নয়। একই টেবিলে মুখোমুখি না বসে দূরবর্তী উপায়ে সম্পাদিত এই শান্তিচুক্তির বাস্তবায়নযোগ্যতা এবং এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাবই বেশি অনুমেয়। অর্থাৎ দুই পক্ষের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব, পারস্পরিক অবিশ্বাস, সর্বোপরি এক ধরনের কাঠামোগত বৈষম্যকেই প্রতীকীভাবে ফুটিয়ে তুলেছে এই চুক্তি স্বাক্ষর প্রক্রিয়া।
সমঝোতা স্মারকটি ওয়াশিংটন এবং তেহরান উভয় পক্ষের জন্যই কৌশলগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এর পেছনে দুই দেশের উদ্দেশ্য ও লাভ সম্পূর্ণ ভিন্ন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন মূলত দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি রক্ষা, মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই যুদ্ধের অবসান চায়। হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখা এবং মার্কিন সেনাদের বড় আঞ্চলিক সংঘাত থেকে দূরে রাখাই ওয়াশিংটনের এই মুহূর্তে প্রধান লক্ষ্য। যদিও এর আড়ালে তারা ইরানকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে বেঁধে রেখে যে কোনো সময় সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প পথ খোলা রেখেছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত ইরানের জন্য চুক্তিটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং বিদেশে আটকে থাকা আর্থিক সম্পদ অবমুক্তকরণের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার একটি সাময়িক সুযোগ। তবে মার্কিন প্রশাসনের উদ্দেশ্য নিয়ে সম্পূর্ণ সন্দিহান ইরান মুখোমুখি না বসে দূরবর্তী ডিজিটাল স্বাক্ষর করার মাধ্যমে নিজস্ব কূটনৈতিক প্রতিরোধ ও আত্মমর্যাদা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।
পাকিস্তানের সহায়তায় এই চুক্তি আপাতদৃষ্টিতে একটি ৬০ দিনের প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি তৈরি করলেও এর দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা ও টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত। এর প্রধান কারণ ইসরায়েলের তীব্র ভিন্নমত; প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধের নির্দেশ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখার ঘোষণা, যা যে কোনো মুহূর্তে এই চুক্তিকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে। পাশাপাশি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার ঐতিহাসিক অবিশ্বাস এবং অতীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পারমাণবিক চুক্তি বাতিলের তিক্ত অভিজ্ঞতা এই সমঝোতার দুর্বল দিক। তদুপরি আগামী ৬০ দিন ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে আলোচনা বাধ্যতামূলক হলেও ওয়াশিংটনের সম্পূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের দাবি এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ পারমাণবিক অধিকারের অনড় অবস্থান পরস্পর সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে এই চুক্তিকে আব্রাহাম চুক্তির সম্প্রসারণ হিসেবে ব্যবহার করে আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মার্কিন চেষ্টা আঞ্চলিক বাস্তবতায় অবাস্তব চিন্তা।
সামগ্রিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে চুক্তিটি দ্বিমুখী ও অস্থির পরিস্থিতির জন্ম দেবে বলে অনুমান। তবে এর আরও সাময়িক ইতিবাচক দিক হলো, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত হলে পারস্য ও ওমান উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলার আশঙ্কা কমবে এবং বিশ্ব তেল-গ্যাস বাণিজ্যে সাময়িক স্বস্তি ফিরে আসবে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের হুথি বা ইরাক ও সিরিয়ার শিয়া মিলিশিয়াদের মতো ইরানি প্রক্সি নেটওয়ার্কগুলোর মার্কিন ঘাঁটিতে সাময়িকভাবে হামলা বন্ধ হবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দীর্ঘমেয়াদি শান্তি বিনির্মাণে সমস্ত প্রধান অংশীজনের অংশগ্রহণ অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ ক্ষেত্রে নেতিবাচক দিক হলো, মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান সামরিক পক্ষ ইসরায়েল এই পুরো প্রক্রিয়ায় অনুপস্থিত। ইসরায়েল যদি মনে করে, এই সমঝোতা ইরানের হাতকে শক্তিশালী করছে, তবে তারা একতরফাভাবে ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হানতে পারে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক নতুন ও গভীর ভূ-রাজনৈতিক মহাবিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে।
দূরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যের এই চুক্তি এবং এর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতির ওপর সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো আমদানি করা জ্বালানি তেল ও এলএনজি। মার্কিন-ইরান চুক্তির কারণে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত থাকায় এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম সাময়িকভাবে স্থিতিশীল হওয়ায় বাংলাদেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা থেকে রক্ষা পাবে। তবে চুক্তিটি যদি টেকসই না হয় এবং পুনরায় যুদ্ধ শুরু হয়, তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে (বিশেষ করে সৌদি আরব, ইউএই, ওমান ও কাতার) লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মী কর্মরত। এই চুক্তির মাধ্যমে যদি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি না আসে এবং ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, তবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়বে, যা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহকে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
অধিকন্তু লোহিত সাগর এবং মধ্যপ্রাচ্যের নৌপথের নিরাপত্তা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ইউরোপ ও আমেরিকায় রপ্তানির জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই চুক্তির স্থায়িত্বের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের সমুদ্রগামী বাণিজ্যের ভাড়া এবং জাহাজের বীমা খরচ। উত্তেজনা কম থাকলে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি খরচ কম থাকবে।
সব দিক বিবেচনায় ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মুহূর্তে কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান না নিয়ে কৌশলগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখাই দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভাবমূর্তির জন্য মঙ্গলজনক। এই যুদ্ধ শুরুর দিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত যে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে সমর্থন করেছিল, আগামী দিনে তার পুনরাবৃত্তি না করাই হবে বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। এ ধরনের জটিল আঞ্চলিক সমীকরণে কোনো এক পক্ষকে পরোক্ষ সমর্থন দেওয়ার চেয়ে নীতিগত ভারসাম্য ও কৌশলগত অবস্থান বজায় রাখাই হবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক দূরদর্শিতার আসল বহিঃপ্রকাশ।
ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী: অধ্যাপক ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
- বিষয় :
- সাজ্জাদ সিদ্দিকী
