ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

সমাজ

প্রাথমিকে শিল্প-সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্তি: ধন্যবাদ তবে সাবধান

প্রাথমিকে শিল্প-সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্তি: ধন্যবাদ তবে সাবধান
×

মামুনুর রশীদ

মামুনুর রশীদ

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ | ০৮:৩৭ | আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬ | ১২:১৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

অন্তর্বর্তী সরকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শারীরিক শিক্ষা (ক্রীড়া) ও সংগীত শিক্ষক নিয়োগের বিধানটি বাদ দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা সংশোধন করেছিল। বিপরীতে বর্তমান সরকার ক্রীড়াসহ শিল্প-সংস্কৃতিকে শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত করছে। এটি অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। শিক্ষা একটি মানুষের পরিপূর্ণ বিকাশের স্থান। সেখানে সংস্কৃতিচর্চা উপেক্ষিত হলে ফলাফল যে কী হয়, তা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে জাপান, জার্মানি, দক্ষিণ কেরিয়া, চীন, ইউরোপের দেশগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো ঘুরে দেখে আমার ধারণা হয়েছে, শিক্ষার একটি বড় স্তম্ভ হিসেবে শিল্প-সংস্কৃতি যুক্ত হওয়া অবশ্যই জরুরি। বর্তমান সরকার বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে বলে ধন্যবাদ জানাই। তবে এ দেশে সব ভালো কাজেরই কিছু প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। আশা করি, সেসব বিষয়েও সরকার নজর রাখবে। 

ক্রীড়া শিক্ষক পাওয়া খুব কঠিন নয়। কিন্তু শিল্প-সংস্কৃতির যথাযথ শিক্ষক পাওয়া দুরূহ। যদিও দেশে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা, সংগীত, নৃত্যকলা, চারুকলার জন্য বিভাগ রয়েছে। প্রতিবছর এসব বিভাগ থেকে ছাত্ররা উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা সম্পন্ন করেন। কিন্তু তাদের জীবিকার কোনো ব্যবস্থা নেই। তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ মেধাবীরা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগ পান। বাকি যে ছাত্ররা রইলেন, তাদের মেধাকে কি কাজে লাগানো সম্ভব হবে এ ক্ষেত্রে?

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পাস করা ছাত্ররা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে রাজি হবেন কিনা? যদি  তাদের জন্য বিশেষ বেতন স্কেলের ব্যবস্থা করা না যায়। সমাজ বাস্তবতা এমন একটি জায়গায় পৌঁছেছে, যে কোনো ভালো উদ্যোগই দিনের শেষে অপঘাতের মধ্যে পড়ে যায়। দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা কম নয় এবং শিক্ষা বিভাগের অদূরদর্শিতা, দুর্নীতি ও অদক্ষতার ফলে ছাত্রদের জীবনের পাঠই নানা বিঘ্নের মধ্যে পড়ে। তাই ঝরে পড়া শিশুর সংখ্যা অনেক। যেখানে উন্নত দেশগুলোতে শিশুরা স্কুলকে নিজের গৃহের চাইতে অনেক আনন্দময় ভাবে। অভিভাবকদের চেয়ে শিক্ষককে অনেক আপন মনে করে। সেখানে আমাদের দেশের ছাত্ররা শিক্ষাকে এক বিভীষিকা বলে মনে করে। গোড়ায় গলদ হলে যা হয় তা-ই ঘটে তাদের জীবনে। ঠিকমতো বিষয়গুলো পাঠ না করে কোচিং শিক্ষকদের দুর্বৃত্তপনায় তারা মূল শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। যেসব প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকরা ১৬ লাখ টাকা দিয়ে চাকরি নিয়েছেন, তাদের উদ্দেশ্যই হয়ে পড়ে কোচিং সেন্টার খুলে ধারদেনা পরিশোধ করা।
এরপর আছে উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তা ও সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার আবদার মেটানো। অথচ পৃথিবীর উন্নত দেশে অশিক্ষকরা শিক্ষায় ছড়ি ঘোরায় না। সে সুযোগই তাদের নেই। 

বিপরীতে এ দেশে শিক্ষকরা শিক্ষাবিষয়ক সব রকম পরিকল্পনা থেকে শুরু করে প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করে থাকেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, ওইসব প্রশাসনিক অফিস একেকটা দুর্বৃত্তের আখড়া। ওখানকার ইট-কাঠও অর্থ উপার্জনের জন্য উদগ্রীব থাকে। 

প্রশাসনিক বিষয়টির সর্বোচ্চ স্থান হচ্ছে মন্ত্রণালয়। সেখানে দায়িত্বহীন আমলাদের বসবাস। সেখানে দেখা গেছে কোনো এক আমলা বিদেশে গিয়ে শিক্ষার বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে এলেন। কিন্তু দুদিন বাদেই তিনি চলে গেলেন বা তাঁর স্থানান্তর হলো আরেক মন্ত্রণালয়ে, যেখানে এই প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান কোনো কাজেই এলো না। আদতে বিদেশ যাওয়াই আমলাদের জন্য এক পুরস্কার। বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জনের ব্যবস্থাও বটে। আমলাদের যে কোনো মন্ত্রণালয়েই সভা করে প্রচুর অর্থ উপার্জন হয়। উচ্চপদস্থ আমলারা নিজেদের সন্তানদের এ দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ান না। অর্থ পাচারের মতোই নিজেদের সন্তানদের পাচার করে দেন বিদেশে। তাই এ দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকে এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিও তাদের দায়বদ্ধতা কাজ করে না। অথচ তিনি নিজে এ দেশেরই কোনো মফস্বলের বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে এতদূর এসেছেন। 

শিক্ষাক্ষেত্রে সবকিছুই অধ্যাপক শাসিত। সিলেবাস তৈরি থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কাজে তারা যুক্ত হন এবং এখান থেকেও বিপুল অর্থ পাচারের সুযোগ করায়ত্ত করেন। তাই সরকারের সদিচ্ছা কোনো কাজে লাগে না। অভিভাবকরাও নিজ সন্তানদের বিষয়ে খুবই সচেতন। তারা কখনোই ব্যবস্থাপনার ত্রুটি নিয়ে কথা বলেন না। যাদের সংগতি আছে, সাত-আটজন টিউটর নিয়োগ করে থাকেন। যাদের সংগতি নেই, তাদের ছেলেমেয়েরা ঝরে পড়ে। 

সারাদেশে ভালো স্কুল বলে পরিচিত কিছু বিদ্যালয় আছে। সেখানে ভর্তির জন্য সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিন্তু সারাদেশে যে একই শিক্ষা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন– এটা ভাবেন না। ওইসব স্কুলে তারা মনে করেন সুযোগ পেলেই হলো। কিন্তু আমাদের সংবিধানে রয়েছে– শিক্ষা সুযোগ নয়, অধিকার। দেশের অধিকাংশ শিশু অধিকার থেকে বঞ্চিত। কারণ তারা সুযোগ পায় না। 

এ রকম পরিবেশে সরকার একটি সদিচ্ছার কথা বলেছে। এই সদিচ্ছা তখনই সাফল্যের পথ দেখবে যখন ছাত্ররা সর্বত্র তাদের সর্বোত্তম শিক্ষকদের দ্বারা প্রশিক্ষিত হবে। আগেও বহুবার বলেছি, আমরা যারা ৫০-৬০ দশকের ছাত্র, শিক্ষকরা খুবই কম বেতন পেতেন। কিন্তু তাদের ছিল শিক্ষার প্রতি অঙ্গীকার। নৈতিকতা, আদর্শ, সত্যবাদিতা, সর্বোপরি অঙ্গীকার মিলে ছাত্রদের কাছে একটি মহৎ চেহারা নিয়ে তারা দাঁড়াতেন। কালক্রমে তা মুছে গেছে। শিক্ষা একটি পণ্যে পরিণত হয়েছে। যদিও আমি মনে করি, এখনও শিক্ষকদের বেতন কাঠামো অত্যন্ত অমর্যাদাকর। আমরা বারবার বলেছি, প্রাথমিক শিক্ষা একটা সেন্টার অব এক্সিলেন্স হওয়া উচিত। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আকৃষ্ট হয়ে চাকরি করতে রাজি হবেন।

দুঃখের সঙ্গে এ কথাও বলতে হয়, যেহেতু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিম্ন বেতনভুক্ত হলেও সরকারি কর্মচারী, তাই তাদের সরকারি বিভিন্ন কাজে নিয়োগ করা হয়। এই কাজ করতে গিয়ে তারা ক্লাসরুমে ঠিকমতো মনোযোগ দিতে পারেন না। এসব কাজ থেকে শিক্ষকদের অব্যাহতি দেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষকদের কাজ হবে আনন্দময় শিক্ষার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। শিশুদের কাছে নিজেদের আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে তোলা। 

অনেক দিন ধরেই শিক্ষার সঙ্গে শিল্প-সংস্কৃতিকে যুক্ত করার কথা নানাভাবে বলে আসছি। ২০০২ সাল থেকে দেশের বিভিন্ন জেলার ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ প্রকল্প ‘আইডিয়েল’-এর সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম। প্রতিটি জেলায় শিক্ষাকে আনন্দময় করে তুলতে যেসব কর্মশালা হয়েছিল, সেসব আয়োজনে অংশ নিয়েছিলাম। উদ্যোগটি তখন খুব প্রশংসা পায়। কিন্তু পরে তা আর অনুসরণ করা হয়নি। এবারও অনেক লেখালেখি করেছি। প্রাথমিক শিক্ষায় শিল্প-সংস্কৃতি যুক্ত করে শিক্ষাকে আনন্দময় করে তোলার প্রস্তাব দিয়েছি। আমাদের কোনো কোনো প্রস্তাব যে কাজে আসেনি, তা বলা যাবে না। 
শিক্ষা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে, সত্য। কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে ওই আমলাদের ওপরেই নির্ভর করতে হয়। সব জায়গায়ই স্কুলের একটি পরিচালনা পরিষদ আছে। এটি সাধারণত সরকারি দল দ্বারাই নির্বাচিত। এই জায়গায়ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকদের স্থান পাওয়া উচিত। কিন্তু রাজনীতি যারা করেন, তাদের এসব ক্ষেত্রে নানা ধরনের আপসের মুখোমুখি হতে হয়। বর্তমান সরকার জিরো টলারেন্স দিয়ে শিক্ষাকে যদি সমুন্নত না করে তাহলে অস্থিরতা, মূল্যবোধহীন ভবিষ্যতের দিকেই চলতে থাকবে এ দেশ। 
মামুনুর রশীদ: সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব

আরও পড়ুন

×