ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

কবি পুনর্পাঠ

প্রয়াণের পঁয়ত্রিশ বছর পরও কেন রুদ্র আজও সমকালীন

প্রয়াণের পঁয়ত্রিশ বছর পরও কেন রুদ্র আজও সমকালীন
×

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ | ১৪:০২

বাংলাদেশে অনেক কবির সাহিত্যিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা হয়, জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ করা হয়, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের পাঠকসংখ্যা সীমিত হয়ে যায়। তবে এই চিত্রের ব্যতিক্রম কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। মৃত্যুর পঁয়ত্রিশ বছর পরও তিনি শুধু সাহিত্য আলোচনার বিষয় নন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, আবৃত্তি, গান এবং তরুণদের ব্যক্তিগত অনুভূতির জগতে তিনি এখনো সক্রিয় উপস্থিতি।

আশির দশকের এই কবি, যিনি ১৯৯১ সালে মৃত্যুবরণ করেন, তিনি কেন ২০২৬ সালের তরুণদের কাছেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক? কেন তাঁর কবিতা পুরোনো হয় না? কেন তাঁর লেখা গান নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে বারবার ফিরে আসে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে রুদ্রকে শুধু প্রেমের কবি বা প্রতিবাদের কবি হিসেবে দেখলে চলবে না। দেখতে হবে একজন ‘ট্রানজিশনাল’ বা সন্ধিক্ষণের কবি হিসেবে। যিনি স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের আশা, হতাশা, স্বপ্নভঙ্গ, প্রতিরোধ এবং আত্মপরিচয়ের সংকটকে একসঙ্গে ধারণ করেছিলেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরের সাহিত্যিক পরিসরে রুদ্রের আবির্ভাব ঘটে এমন এক সময়ে, যখন রাষ্ট্র ও সমাজের বাস্তবতা মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের সঙ্গে ক্রমশ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। স্বাধীনতার আদর্শ, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবমুক্তির যে কল্পনা ছিল, বাস্তবতার সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়ছিল। এই ব্যবধানই রুদ্রের কবিতার অন্যতম উৎস।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সাহিত্যিক বাস্তবতায় যখন রাষ্ট্র ও সমাজ মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের সঙ্গে ক্রমশ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছিল, তখন সেই দ্বন্দ্বই রুদ্রের কবিতার মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার আদর্শ, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবমুক্তির স্বপ্ন বাস্তবতার সঙ্গে ব্যবধান তৈরি করলে সেই ভাঙনের ভাষাই তিনি কবিতায় তুলে ধরেন।

তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ কেবল সাহিত্যকর্ম নয়, বরং স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবেকের দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। সেখানে তিনি তীব্র ক্ষোভে লিখেছিলেন-

“আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই
আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য দেখি,
ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে
এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দু:স্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়”

এই কবিতার মাধ্যমে তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কেবল রাষ্ট্রীয় স্লোগানে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের জীবন ও মর্যাদার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।

রুদ্রের অন্যতম শক্তি ছিল তাঁর বহুমাত্রিক পরিচয়। তিনি একদিকে প্রেমের কবি, অন্যদিকে রাজনৈতিক কবি। একই সঙ্গে তিনি যেমন বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছেন, তেমনি ব্যক্তিগত ভাঙনের কথাও অকপটে লিখেছেন। বাংলা কবিতায় এই দুই ধারা সাধারণত আলাদা হলেও তাঁর লেখায় তা একসূত্রে গাঁথা হয়েছে।

তিনি লিখেছিলেন-
“তুমি জানো নাই, আমি তো জানি,
কতোটা গ্লানিতে এতো কথা নিয়ে,
এতো গান, এতো হাসি নিয়ে বুকে
নিশ্চুপ হয়ে থাকি”

আসলে তাঁর কবিতার কেন্দ্রে ছিল মানুষ। রাষ্ট্র, রাজনীতি, প্রেম, সমাজ-সবকিছুই তিনি মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বিচার করেছেন। ফলে তাঁর কবিতার ভাষা কখনও কেবল মতাদর্শের ভাষা হয়ে ওঠেনি। তা হয়ে উঠেছে মানবিক অভিজ্ঞতার ভাষা।

আধুনিক চিন্তার কবি হিসেবে রুদ্রের গুরুত্ব শুধু রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে নয়। ব্যক্তি-স্বাধীনতা, আত্মপ্রকাশের অধিকার এবং প্রতিষ্ঠিত সত্যকে প্রশ্ন করার সাহস তাঁকে আলাদা করে তোলে।

তিনি লিখেছেন-
“পেটের ওপর উঠে এলো দুই জোড়া বুট, কালো ও কর্কশ।
কারণ, সে তার পাকস্থলীর কষ্টের কথা বলেছিল,
বলেছিল অনাহার ও ক্ষুধার কথা।”

এই প্রশ্নগুলো আজও অমীমাংসিত। রাষ্ট্র কার জন্য, স্বাধীনতা কাদের জন্য, ক্ষমতা কেন জবাবদিহিতাহীন থাকবে।

বর্তমান জেন-জি প্রজন্মের সঙ্গে রুদ্রের সংযোগ এখানেই। এই প্রজন্ম কর্তৃত্বকে সহজে মেনে নেয় না, প্রশ্ন করে, ব্যক্তিস্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেয় এবং অভিজ্ঞতাকে মূল্য দেয়। রুদ্রের কবিতার ভেতরও এই প্রবণতা স্পষ্ট। তিনি কোনো চূড়ান্ত সত্য চাপিয়ে দেননি, বরং প্রশ্ন তুলেছেন, অনুসন্ধান করেছেন।

তিনি লিখেছেন-
“যে যাবে না সে থাকুক, চলো আমরা এগিয়ে যাই।
যে সত্য জেনেছি পুড়ে, রক্ত দিয়ে যে মন্ত্র শিখেছি,
আজ সেই মন্ত্রের সপক্ষে নেবো দীপ্র হাতিয়ার,
স্লোগানে কাঁপুক বিশ্ব, চলো আমরা এগিয়ে যাই।”

রুদ্রের কবিতার আরেকটি বড় শক্তি তাঁর সহজ কিন্তু গভীর ভাষা। তিনি জটিল ভাবনাকে দুর্বোধ্য না করে সরল ও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন। তাঁর কবিতা দার্শনিক হলেও বোঝার বাইরে যায় না, রাজনৈতিক হলেও স্লোগানে পরিণত হয় না, প্রেম হলেও কৃত্রিমতায় আটকে থাকে না।

“থাকুক তোমার একটু স্মৃতি থাকুক,
একলা থাকার খুব দুপুরে
একটি ঘুঘু ডাকুক।”

এই ভাষার কারণেই তাঁর কবিতা আবৃত্তি মঞ্চ থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যন্ত সহজে গ্রহণযোগ্য হয়েছে।

রুদ্রের জনপ্রিয় গানগুলোও তাঁর প্রাসঙ্গিকতার একটি বড় কারণ। বাংলা সাহিত্যে খুব কম কবির ক্ষেত্রেই দেখা যায়, কবিতা ও গান উভয় মাধ্যমেই তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে প্রভাবিত করছেন। তাঁর কবিতার সংগীতায়ন তাঁকে নতুন পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। অনেক তরুণ প্রথমে গান শুনে রুদ্রকে আবিষ্কার করে, পরে কবিতার জগতে প্রবেশ করে। কণ্ঠশিল্পী আর ব্যান্ডের হাত ধরে আজও প্রতিটি তরুণ হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয় তাঁর সেই কালজয়ী গান-

“আমার ভেতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে
আছো তুমি হৃদয় জুড়ে...”

তবে রুদ্রের স্থায়ী আবেদন কেবল জনপ্রিয়তা বা প্রেমের কবি হওয়ার কারণে নয়। তাঁর লেখার কেন্দ্রে যে মানবিক সততা রয়েছে, সেটিই তাঁকে সময়ের পরীক্ষায় টিকিয়ে রেখেছে। তিনি নিজের ভাঙন, হতাশা ও একাকিত্বকে আড়াল করেননি। বরং একজন অসম্পূর্ণ মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন।

তিনি লিখে গেছেন
“আমি সেই পোড়া ভিত ভেঙে জেগে উঠেছি জীবনে,
আমি সেই কালো ঘোড়ার লাগাম ধ’রে আছি টেনে।
বুকের ভাষাকে সাজিয়ে রনের সজ্জায়,
আমি বুনে দিই শব্দ-প্রেরণা মানুষের লোহু মজ্জায়।”

১৯৯১ সালের ২১ জুন তাঁর জীবন থেমে গেলেও তাঁর সাহিত্যিক যাত্রা থেমে যায়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পাঠ আরও বিস্তৃত হয়েছে। কারণ তিনি কেবল তাঁর সময়ের কথা বলেননি; তিনি এমন কিছু মৌলিক মানবিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন, যা প্রতিটি সময়েই নতুনভাবে ফিরে আসে।

রুদ্র স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বিবেকের অন্যতম কণ্ঠস্বর। তিনি এমন এক কবি, যিনি তাঁর সময়কে অতিক্রম করে ভবিষ্যতের পাঠকের জন্যও ভাষা তৈরি করেছিলেন।

প্রয়াণের পঁয়ত্রিশ বছর পর দাঁড়িয়ে, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর সবচেয়ে বড় সাফল্য তাঁর কবিতার সৌন্দর্যে নয়, তাঁর সমকালীনতায়। তার লেখনী আজও উদ্ধৃত হন, কারণ তাঁর প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও মেলেনি। আর তিনি আজও তরুণদের কবি, কারণ তাঁর কবিতায় এখনও ভবিষ্যতের জন্য একটি অস্থির, অসমাপ্ত এবং মানবিক স্বপ্ন বেঁচে আছে।

আরও পড়ুন

×