সমকালীন প্রসঙ্গ
জ্বালানি গণতন্ত্রের পথে কতটা এগোল দেশ
এফ এম আনোয়ার হোসেন
এফ. এম. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ | ১০:১১
দেশে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে উৎসাহিত করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর ও শুল্ক সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে। সৌর প্যানেল উৎপাদন ও স্থাপনে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও উপকরণের ওপর শুল্ক অব্যাহতি, কিছু ক্ষেত্রে ভ্যাট ও অগ্রিম কর প্রত্যাহার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য কর-সুবিধা অব্যাহত রাখার প্রস্তাব নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
সরকারের যুক্তি, এসব পদক্ষেপ সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় কমাবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে। প্রশ্ন হলো, কর ছাড় কি জ্বালানি রূপান্তরের সমার্থক? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এই নীতিগুলো কি জনগণকে জ্বালানি ব্যবস্থার অংশীদার করছে, নাকি কেবল নতুন বাজার তৈরি করছে?
দেশের জ্বালানি খাত দীর্ঘদিন ধরে আমদানিনির্ভর। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস, কয়লা, ফার্নেস অয়েল এবং আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা অর্থনীতিকে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার কাছে জিম্মি করে রেখেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের চাপ, জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন কেবল পরিবেশগত প্রয়োজন নয়; অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, জাতীয় স্বার্থ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রশ্ন।
বাস্তবতা হচ্ছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে বাংলাদেশের যাত্রা এখনও প্রত্যাশার তুলনায় অনেক পিছিয়ে। ২০০৮ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে ২০২০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছিল। সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি; বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ সক্ষমতার মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎসভিত্তিক। অথচ ২০২৫ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই ব্যবধান একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়– লক্ষ্য নির্ধারণ সহজ, বাস্তবায়নে প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন।
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে আলোচনার বড় সীমাবদ্ধতা হলো আমরা প্রায় সবকিছু সৌরবিদ্যুতে সীমাবদ্ধ রাখি। সৌরশক্তি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ভৌগোলিক বাস্তবতা আরও বিস্তৃত সম্ভাবনার কথা বলে। দেড় হাজারের বেশি নদীর এই দেশে নদীর স্রোতভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রযুক্তি নিয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা হয়নি। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘হাইড্রোকিনেটিক টেকনোলজি’ ব্যবহার করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে টারবাইন স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, তিস্তা কিংবা উপকূলীয়, সিলেট ও অন্যান্য অঞ্চলের নদীর নির্দিষ্ট অংশে পরীক্ষামূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে নতুন প্রযুক্তিগত দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
একইভাবে কক্সবাজার, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, হাতিয়া এবং উপকূলীয় অঞ্চলে বায়ুশক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি বর্জ্য, পশু বর্জ্য, পৌর বর্জ্য এবং জলজ আগাছা থেকেও শক্তি উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি বৈচিত্র্য কোনো বিলাসিতা নয়; এটি কৌশলগত প্রয়োজন।
প্রযুক্তি কেবল আমদানি করে টেকসই জ্বালানি রূপান্তর সম্ভব নয়। বর্তমানে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি, কন্ট্রোলার এবং অধিকাংশ যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে কর ছাড়ের সুবিধার একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত বিদেশি উৎপাদকদের কাছেই চলে যায়। তাই প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি শুধু প্রযুক্তির ভোক্তা হয়ে থাকব, নাকি প্রযুক্তির উৎপাদকও হব?
আমার মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিকে শিল্পনীতির সঙ্গে যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। দেশে সৌর মডিউল, ব্যাটারি, চার্জ কন্ট্রোলার, স্মার্ট মিটার, ক্ষুদ্র টারবাইন এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশ উৎপাদনের জন্য বিশেষ শিল্পাঞ্চল, গবেষণা তহবিল এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর কর্মসূচি প্রয়োজন। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হবে।
এই খাতে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ দক্ষ জনশক্তির অভাব। আগামী ১০ বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে হাজার হাজার প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, ইনস্টলেশন বিশেষজ্ঞ, মান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা এবং গবেষক প্রয়োজন হবে। কিন্তু আমাদের কারিগরি শিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা এখনও সেই চাহিদা পূরণের জন্য পর্যাপ্তভাবে প্রস্তুত নয়। তাই পলিটেকনিক, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি, শক্তি সঞ্চয় প্রযুক্তি, স্মার্ট গ্রিড এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিশেষ কর্মসূচি চালু করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি অর্থনৈতিক। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত কি কেবল বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর নতুন বিনিয়োগ ক্ষেত্র হবে, নাকি এটি জনগণের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যম হবে? দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত বিকেন্দ্রীভূত জ্বালানি উৎপাদন। গ্রামের কৃষক, জেলে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা, সমবায় এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠান যদি বিদ্যুৎ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিক্রয়ের অংশীদার হতে পারে, তাহলে একটি নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হবে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, কমিউনিটি সোলার, নদীভিত্তিক ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ প্রকল্প, সৌরচালিত সেচ এবং অফ-গ্রিড প্রযুক্তি স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে।
এখানেই আসে ‘এনার্জি ডেমোক্রেসি’ বা জ্বালানি গণতন্ত্রের ধারণা। জ্বালানি শুধু পণ্য নয়; এটি উন্নয়ন, ক্ষমতায়ন এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা যদি কেবল কয়েকটি বৃহৎ করপোরেশন বা কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যায়, তাহলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি হয়তো বাড়বে, কিন্তু জ্বালানি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। অন্যদিকে জনগণ, স্থানীয় সরকার, সমবায় এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা যদি এই ব্যবস্থার অংশীদার হয়, তাহলে জ্বালানি রূপান্তর একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরে পরিণত হবে।
এবারের বাজেট নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। কিন্তু কর ছাড় নিজে কোনো জ্বালানি বিপ্লব ঘটাতে পারে না। প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন গবেষণা, স্থানীয় প্রযুক্তি উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ, উদ্ভাবনী অর্থায়ন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার বিকাশ এবং জনগণের অংশগ্রহণভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থা। দেশের সামনে ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। আমরা চাইলে আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতির বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে এসে নদী, সূর্য, বায়ু এবং মানুষের সৃজনশীলতাভিত্তিক একটি টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারি।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি কেবল কর ছাড়ে সন্তুষ্ট থাকব, নাকি জ্বালানি গণতন্ত্রের পথে সত্যিকারের যাত্রা শুরু করব?
এফ এম আনোয়ার হোসেন: উন্নয়ন ও পরিবেশবিষয়ক গবেষক
- বিষয় :
- জ্বালানি