দুর্যোগ
নগর পানি ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
মো. জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন, পুরোনো পাইপলাইন, অদৃশ্য পানির অপচয় এবং ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ব্যয়–এসব চ্যালেঞ্জ আজকের শহরগুলোর পানি ব্যবস্থাপনাকে দিন দিন জটিল করে চলছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের নগর এলাকায় নিরাপদ, নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন শুধু অবকাঠামোগত বিষয় নয়; এটি প্রযুক্তি, তথ্য ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার সমন্বিত চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় স্মার্ট নগর পানি ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ ভবিষ্যতের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স পানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে শুধু পর্যবেক্ষণই করে না, বরং বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত, নির্ভুল ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। প্রচলিত পদ্ধতিতে লিক শনাক্তকরণ, পানির চাপ নিয়ন্ত্রণ বা পাম্প পরিচালনা অনেকাংশে ম্যানুয়াল পরিদর্শন, বিলম্বিত প্রতিবেদন এবং অভিজ্ঞতাভিত্তিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আধুনিক শহরের দ্রুত পরিবর্তনশীল চাহিদা মোকাবিলায় এই পদ্ধতি যথেষ্ট নয়। এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাৎক্ষণিক ও ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করে পানি ব্যবস্থাপনাকে আরও গতিশীল, তথ্যনির্ভর ও ফলপ্রসূ করতে পারে।
স্মার্ট পানি ব্যবস্থাপনার একটি বড় ক্ষেত্র হলো লিক বা পাইপলাইনের ছিদ্র শনাক্তকরণ। অনেক সময় পাইপলাইনের ক্ষতি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে তা বিপুল পরিমাণ পানির অপচয় ঘটায়। এর ফলে নন-রেভিনিউ ওয়াটার বৃদ্ধি পায়, অর্থাৎ এমন পানি; যা উৎপাদন ও সরবরাহ করা হলেও রাজস্ব আয়ে প্রতিফলিত হয় না। সেন্সর, স্মার্ট মিটার, চাপের রিডিং এবং ফ্লো ডেটা ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অস্বাভাবিক প্রবাহ বা চাপের পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারে।
এর মাধ্যমে বড় ক্ষতি হওয়ার আগেই সম্ভাব্য লিকের অবস্থান চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। পানির চাহিদা পূর্বাভাসের ক্ষেত্রেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একটি শহরে পানির চাহিদা সব সময় একই থাকে না। ঋতু, আবহাওয়া, জনসংখ্যা, শিল্পকারখানার ব্যবহার, ছুটির দিন– এমনকি বিশেষ পরিস্থিতির ওপরও পানির ব্যবহার নির্ভর করে। মেশিন লার্নিং মডেল অতীতের ব্যবহার, আবহাওয়ার তথ্য, স্মার্ট-মিটার ডেটা এবং জলাধারের পানির স্তর বিশ্লেষণ করে স্বল্পমেয়াদি ও মধ্যমেয়াদি চাহিদা পূর্বাভাস দিতে পারে। এর ফলে পানি সরবরাহকারী সংস্থা আগে থেকেই পাম্প পরিচালনা, জলাধার ব্যবস্থাপনা এবং বিতরণ পরিকল্পনা সাজাতে পারে।
পাম্পিং ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনা স্মার্ট পানি ব্যবস্থাপনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় পাম্প পরিচালনায় বিপুল বিদ্যুৎ ব্যয় হয়। কখন কোন পাম্প চালু হবে, কতক্ষণ চলবে, কোন এলাকায় কত চাপ প্রয়োজন–এসব সিদ্ধান্ত সঠিকভাবে নিতে না পারলে জ্বালানি অপচয় বাড়ে এবং ব্যবস্থার স্থায়িত্ব কমে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অপ্টিমাইজেশন মডেল বিদ্যুতের খরচ, পানির চাহিদা, জলাধারের ধারণক্ষমতা এবং পাইপ নেটওয়ার্কের অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে পাম্প পরিচালনার সর্বোত্তম সময়সূচি নির্ধারণে সহায়তা করতে পারে। এতে একদিকে জ্বালানি সাশ্রয় হয়, অন্যদিকে সেবার নির্ভরযোগ্যতা বাড়ে।
এই প্রযুক্তিগত কাঠামো গড়ে তুলতে বিভিন্ন ধরনের উপাত্ত ব্যবহার করা যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্লো রেকর্ড, চাপের রিডিং, স্মার্ট-মিটার ডেটা, জলাধারের পানির স্তর, পাম্প পরিচালনার তথ্য, আবহাওয়ার তথ্য, জিআইএস মানচিত্র এবং পাইপ নেটওয়ার্কের তথ্য। এসব ডেটার ওপর ভিত্তি করে র্যান্ডম ফরেস্ট, সাপোর্ট ভেক্টর মেশিন, আর্টিফিশিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্ক, এলএসটিএম এবং অটোএনকোডার-ভিত্তিক অস্বাভাবিকতা শনাক্তকরণ মডেলের মতো বিভিন্ন মেশিন লার্নিং পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অ্যালগরিদম নয়। বাস্তব সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে দুর্বল ডেটার মান, পর্যাপ্ত সেন্সরের অভাব, পুরোনো অবকাঠামোর অসম্পূর্ণ রেকর্ড, সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি, দক্ষ জনবলের ঘাটতি এবং দৈনন্দিন ইউটিলিটি কার্যক্রমে নতুন প্রযুক্তি একীভূত করার জটিলতা। তাই সফল স্মার্ট পানি ব্যবস্থাপনার জন্য শুধু সফটওয়্যার বা মডেল তৈরি করলেই হবে না; প্রয়োজন মানসম্মত তথ্যভান্ডার, আধুনিক সেন্সর নেটওয়ার্ক, প্রশিক্ষিত জনবল, সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো এবং নীতিনির্ভর বাস্তবায়ন পরিকল্পনা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পানি সরবরাহকারী সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে ডিজিটাল পানি ব্যবস্থাপনার দিকে এগোচ্ছে। সেন্সর, মিটার, হাইড্রোলিক মডেল, আবহাওয়ার তথ্য ও মেশিন লার্নিং মডেল একত্র করে তারা পানি কার্যক্রমকে আরও দক্ষ, সহনশীল ও টেকসই করার চেষ্টা করছে। আমাদের শহরের ক্ষেত্রেও এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যেখানে নন-রেভিনিউ ওয়াটার বেশি, পাইপলাইন পুরোনো, জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে এবং জলবায়ু অনিশ্চয়তা বাড়ছে, সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পানি ব্যবস্থাপনায় গুণগত পরিবর্তন আনতে পারে।
দেশের নগর এলাকায় পরিকল্পিতভাবে এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করা গেলে পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়বে। একই সঙ্গে কমবে অপচয়, কমবে জ্বালানি ব্যয় এবং উন্নত হবে নাগরিক সেবা। তাই স্মার্ট পানি ব্যবস্থাপনা আর ভবিষ্যতের বিলাসী ধারণা নয়; এটি আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার অপরিহার্য বাস্তবতা।
ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম: সাবেক অধ্যাপক, পুরকৌশল, চুয়েট
- বিষয় :
- দুর্যোগ