ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

শিশু ধর্ষণ মামলার রায়

ধোবাউড়ার দৃষ্টান্ত অনুসৃত হউক

ধোবাউড়ার দৃষ্টান্ত অনুসৃত হউক
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় শিশু ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে দশ কার্যদিবসের মধ্যে আদালত বৃহস্পতিবার যেই রায় দিয়াছেন, উহা নজির সৃষ্টি করিল। মাসখানেক পূর্বে আমরা দেখিয়াছি, রাজধানীর পল্লবীর শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে সম্পন্ন হইয়াছিল। পল্লবীর ঘটনায় দেশজুড়িয়া ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হইয়াছিল, কিন্তু ধোবাউড়ার শিশুটির ক্ষেত্রে সেই ধরনের চাপ দেখা না যাইলেও দ্রুত রায়ের দৃষ্টান্ত ইতিবাচক। এই মামলায় অপরাধ প্রমাণিত হইবার কারণে তিনজনকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯-এর ৩ ধারা মোতাবেক মৃত্যুদণ্ডাদেশ ও দুই লক্ষ টাকা করিয়া অর্থদণ্ড করা হইয়াছে।

ধোবাউড়ার ঘটনাটি সত্যিই বেদনাদায়ক। বাজার হইতে চিপস ক্রয় করিয়া বাড়ি ফিরিবার পথে কদম ফুল দিবার কথা বলিয়া জঙ্গলে লইয়া শিশুটিকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করে অপরাধীরা। ইহার পর শিশুটিকে পানিতে নিমজ্জিত করিয়া মৃত্যু নিশ্চিত হইলে মরদেহ পুঁতিয়া রাখে। এহেন পৈশাচিকতা ও নৃশংসতা আমাদের হতবাক না করিয়া পারে না। শিশুর এহেন পরিণতি পিতা-মাতা তো বটেই, সচেতন কাহারও পক্ষেই মানিয়া লওয়া কঠিন। হতাশার বিষয়, পল্লবীর শিশুহত্যার ঘটনায় যেইভাবে সবাই সোচ্চার হইয়াছিল, সরকার ও প্রশাসন তৎপর হইয়াছিল এবং সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দ্রুততম সময়ে আদালতের রায়ের অল্প সময়ের মধ্যেই আরেকটি শিশু এহেন নির্মম পরিস্থিতির শিকার হইয়াছে।  

স্বস্তির বিষয়, পুলিশ ঘটনার দিবসেই শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করিয়াছিল এবং ৯ দিবসের মধ্যে আদালতে চার্জশিট দাখিল করিতে সক্ষম হয়। এই রায়ে প্রমাণ হইল, রাষ্ট্র ইচ্ছা করিলে যেই কোনো অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করিতে পারে। পল্লবীর শিশুটির মামলার রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা লিখিয়াছে, শিশু ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিটি ঘটনাতেই আইন নিজস্ব গতিতে চলুক। আইনেই বলা রহিয়াছে কত দিবসে তদন্ত হইবে, কত দিবসের মধ্যে চার্জশিট ও আলামত সংগ্রহ করিতে হইবে। উহা যদ্রূপ সর্বক্ষেত্রে প্রতিপালন জরুরি, তদ্রূপ ন্যায়বিচারের স্বার্থে তদন্তকারী সংস্থা, প্রসিকিউশন বা রাষ্ট্রপক্ষ, ডিফেন্স বা আসামিপক্ষ, সাক্ষী তথা বিচারব্যবস্থার সকল অংশীজনের সমন্বিত দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করিতে হইবে।

শিশুর উপর চলমান নৃশংসতার ঘটনাসমূহ প্রমাণ করিতেছে রাষ্ট্র শিশুদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হইয়াছে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। কোনো শিশু যৌন নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা হত্যার শিকার হইলে উহা কেবল পরিবার নহে; গোটা সমাজকেই আহত করে। সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি নৃশংসতা ও বর্বরতার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাইয়াছে এবং দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিও এই ক্ষেত্রে প্রভাবক ভূমিকা পালন করিতেছে। সেই জন্য সরকারকে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে মনোযোগী হইতে হইবে। 

ধোবাউড়ার শিশুটির ক্ষেত্রে আদালতের রায়ই যথেষ্ট নহে, বরং দ্রুততম সময়ে কার্যকারিতার মধ্যেই উহার সফলতা। ধর্ষণ রায়ের ক্ষেত্রে দেখা গিয়াছে, মামলায় অনেক ক্ষেত্রেই বিচারিক আদালতে রায় হইলেও উহা কার্যকর হইতে বিলম্ব হয়। আপিল, পাল্টা আপিল নিষ্পত্তি হইতে দীর্ঘ সময় লাগিয়া যাইবার কারণে অপরাধীরা জামিন পাইয়া যায়। সেইজন্য আমরা বিশ্বাস করি, ধোবাউড়ার শিশুটির মামলার রায় এই দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে পড়িবে না। শিশুটির মা-বাবাও দ্রুত রায় কার্যকর করিবার জন্য রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানাইয়াছেন। বস্তুত এই প্রত্যাশা দেশের সকল নাগরিকের এবং এই রায় কার্যকরের মধ্য দিয়া শিশু সুরক্ষার পথ প্রশস্ত হউক। আর যাহাতে কোনো শিশুকে এহেন পৈশাচিকতার মধ্যে পড়িতে না হয়, তজ্জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি নাগরিকদেরও তৎপর থাকিতে হইবে।
 
 

আরও পড়ুন

×