কয়েক লাখ অভিবাসী কর্মীকে ছাঁটাইয়ের নির্দেশ ট্রাম্প প্রশাসনের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ১২:২০
মানবিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করা কয়েক লাখ বিদেশি কর্মীর চাকরি আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দিয়েছে দেশটির সরকার। শুক্রবার ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি নিয়োগকর্তাদের এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই ‘টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস’ (টিপিএস) কর্মসূচি সীমিত করার চেষ্টা করে আসছে।
মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসনবিষয়ক সংস্থা (ইউএসসিআইএস) জানিয়েছে, টিপিএস সুবিধাভোগী হাইতির নাগরিকদের কাজের অনুমতির মেয়াদ আগামী ২৪ জুলাই শেষ হবে। ইথিওপিয়া, মিয়ানমার, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেনের নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭ জুলাই পর্যন্ত।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে হাইতি ও সিরিয়ার নাগরিকদের জন্য টিপিএস সুবিধা বাতিলের ক্ষমতা ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে বহাল রাখে। সেই রায়ের পরই নতুন এই নির্দেশনা দেওয়া হলো।
সিদ্ধান্তটি কার্যকর হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা চাকরি হারানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের (ডিপোর্টেশন) ঝুঁকিতে পড়বেন। বর্তমানে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার হাইতির এবং ৬ হাজার ১০০ সিরিয়ার নাগরিক টিপিএসের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ বা গৃহসংঘাতের কারণে নিজ দেশে নিরাপদে ফিরতে না পারা বিদেশিদের মানবিক বিবেচনায় এই বিশেষ সুরক্ষা দিয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্র।
অভিবাসনবিষয়ক সংগঠন ন্যাশনাল ইমিগ্রেশন ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ইথিওপিয়া, মিয়ানমার, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান ও ইয়েমেনের আরও প্রায় ২০ হাজার নাগরিকও এই সুবিধার আওতায় রয়েছেন।
ইউএসসিআইএস সম্প্রতি কয়েক দফায় কাজের অনুমতির মেয়াদ পরিবর্তন করেছে। প্রথমে মেয়াদ ১ জুলাই পর্যন্ত নির্ধারণ করা হলেও পরে তা বাড়িয়ে ১০ জুলাই করা হয়। এরপর শুক্রবার নতুন করে দেশভেদে সময়সীমা নির্ধারণ করে নোটিশ জারি করা হয়।
তবে নতুন নির্দেশনা পৌঁছানোর আগেই অনেক নিয়োগকর্তা সংশ্লিষ্ট কর্মীদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেন। আবার কেউ কেউ সুপ্রিম কোর্টের রায় কার্যকর হতে আরও সময় লাগতে পারে-এমন ধারণায় কর্মীদের বেতন তালিকায় বহাল রেখেছিলেন।
আমেরিকান বিজনেস ইমিগ্রেশন কোয়ালিশনের আইনি উপদেষ্টা জ্যাকব মন্টি বলেন, মেয়াদের তারিখ বারবার পরিবর্তিত হওয়ায় অনেক নিয়োগকর্তা বিভ্রান্তিতে পড়েছেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, বৈধ কাজের অনুমতি নেই-এমন কাউকে চাকরিতে রাখলে আইনি জটিলতায় পড়তে হতে পারে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘টিপিএস এখনো পুরোপুরি বাতিল হয়নি। ইউএসসিআইএস চাইলে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারত। অনিশ্চয়তার কারণে অনেক নিয়োগকর্তা সময়ের আগেই কর্মীদের ছাঁটাই করেছেন।’
হাইতির হাজারো টিপিএস সুবিধাভোগী যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা, বৃদ্ধাশ্রম, উৎপাদন, নির্মাণ ও পরিবহন খাতে কর্মরত। ফলে নতুন সিদ্ধান্ত এসব খাতে শ্রমিক সংকট তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। হাইতি ও সিরিয়ার পাশাপাশি বাকি পাঁচ দেশের টিপিএস সুবিধাও বাতিলের ইচ্ছা আগেই প্রকাশ করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। যদিও ফেডারেল আদালতে চলমান মামলার কারণে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন আটকে ছিল। তবে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায় নিম্ন আদালতগুলোতেও প্রশাসনের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিয়োগকর্তাদের পাঠানো সরকারি নোটিশেও সুপ্রিম কোর্টের রায়ের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, নিম্ন আদালতগুলোও উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করবে বলে প্রশাসনের প্রত্যাশা। তবে হাইতি ও সিরিয়ার নাগরিকদের আইনজীবীদের দাবি, টিপিএস বাতিলের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এতে জাতিগত বৈষম্যের প্রতিফলন রয়েছে।
এরই মধ্যে লেবাননের নাগরিকদের জন্য টিপিএসের মেয়াদ বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রেও সুরক্ষা সুবিধা বাতিলের প্রক্রিয়া দ্রুত এগোতে পারে। এর মধ্যে আগামী সেপ্টেম্বরের শুরুতেই এল সালভাদরের প্রায় দুই লাখ নাগরিকের টিপিএস সুবিধা বাতিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
১৯৯০ সালে চালু হওয়া টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস (টিপিএস) কর্মসূচির মাধ্যমে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য সংকটাপন্ন দেশগুলোর নাগরিকদের অস্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস ও কাজের সুযোগ দেওয়া হয়। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, আগের সরকারগুলো বারবার মেয়াদ বাড়ানোর ফলে অস্থায়ী এই কর্মসূচি কার্যত স্থায়ী অভিবাসনের পথে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে অভিবাসী অধিকারকর্মীরা ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেছেন, টিপিএস সুবিধাভোগী অনেক দেশের পরিস্থিতি এখনো নিরাপদ নয়। তাই এ মুহূর্তে সুরক্ষা সুবিধা প্রত্যাহার মানবিক সংকট আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
- বিষয় :
- যুক্তরাষ্ট্র
- ট্রাম্প প্রশাসন