নির্বাচনকালীন সরকার
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আদালতের বার্তা
বদিউল আলম মজুমদার
বদিউল আলম মজুমদার
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৯ | আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সাম্প্রতিক সময়ে আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে এ ব্যবস্থা পুনর্বহালের যে সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি বিচারিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এই রায়ের মাধ্যমে আবারও সামনে এসেছে নির্বাচনকালীন সরকারের চরিত্র, নির্বাচন কমিশনের কার্যকারিতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে বহুদিনের বিতর্ক।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাংলাদেশের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয় ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন এবং এমন একটি নির্বাচনকালীন ব্যবস্থার দাবি, যার প্রতি সরকার ও বিরোধী দল উভয়েরই আস্থা থাকবে। পরবর্তীকালে উচ্চ আদালতে দায়ের হওয়া এক রিটের পর ২০১১ সালের ১০ মে আপিল বিভাগ, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করলেও তা আরও দুই মেয়াদ বহাল রাখার সুযোগ রাখেন। একই সঙ্গে আদালত সংসদ চাইলে বিচারপতিদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বাইরে রাখার লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধনের পর্যবেক্ষণ দেন।
এই বিচারিক সিদ্ধান্তের পর ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সংসদের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এর আগে গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার পক্ষে মত দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই সুপারিশ গ্রহণ না করে সরকার সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্ত করে।
এরপর দীর্ঘ সময় বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে ২০২৪ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) পক্ষ থেকে আমরা পাঁচজন হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করি। হাইকোর্ট আংশিকভাবে আমাদের পক্ষে রায় দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের সাংবিধানিক ভিত্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। একই সঙ্গে সংবিধানের ৭ক ও ৭খ অনুচ্ছেদকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন এবং সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে সুনির্দিষ্ট সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধানও পুনর্বহাল করেন। পরবর্তীকালে আপিল বিভাগও এই রায় বহাল রাখায় বিষয়টি নতুন সাংবিধানিক তাৎপর্য লাভ করেছে।
এই রায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সংবিধান বাতিল, স্থগিতকরণ ইত্যাদি প্রশ্নে আদালতের সুস্পষ্ট অবস্থান। আদালত সংবিধানবহির্ভূত উপায়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল কিংবা জনগণের সাংবিধানিক অধিকার সংকুচিত করার উদ্দেশ্যে প্রণীত কিছু বিধানকে অসাংবিধানিক বলে অভিহিত করেছেন। ফলে সংবিধান সম্পর্কে জনগণের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে আসার এই প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্নও সামনে এসেছে। নির্বাচন কমিশন তো সংবিধানস্বীকৃত একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। তাহলে কেন নির্বাচনকালীন আরেকটি আলাদা কাঠামোর প্রয়োজন হবে?
এ প্রশ্নের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল নির্বাচনকে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করা। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ভিন্ন বাস্তবতার কথা বলে। নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হওয়ার মর্যাদা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতাসীন সরকারের প্রভাব, কমিশনার নিয়োগে পক্ষপাত, প্রশাসনের দলীয়করণ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার রাজনৈতিক ব্যবহার–এসব কারণে কমিশন অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারেনি।

এই বাস্তবতা শুধু নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রেই নয়; দুর্নীতি দমন কমিশনসহ অনেক সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। অর্থাৎ শুধু প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করাই যথেষ্ট নয়; প্রতিষ্ঠানকে কার্যকরভাবে স্বাধীন রাখার রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
তবু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমর্থকদের যুক্তি হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচনের সময়টিই সবচেয়ে স্পর্শকাতর। ক্ষমতাসীন সরকার প্রশাসন, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং মাঠপর্যায়ের সরকারি কাঠামোর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। ফলে নির্বাচন কমিশন কাগজে-কলমে স্বাধীন হলেও বাস্তবে অনেক সময় কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে না। এই অভিজ্ঞতা থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার দাবি উঠেছে।
অন্যদিকে সমালোচকদের বক্তব্যও বিবেচনার দাবি রাখে। তাদের মতে, প্রতিবার নতুন নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের পরিবর্তে নির্বাচন কমিশনকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক ও শক্তিশালী করা হলে দীর্ঘ মেয়াদে সেটিই হবে অধিক টেকসই সমাধান। কারণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত একটি স্থায়ী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ওপরই থাকা উচিত।
বাস্তবতা হলো, এই দুই অবস্থানের মধ্যে কোনোটি এককভাবে সব সমস্যার সমাধান নয়। শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন এমন একটি নির্বাচনকালীন পরিবেশ, যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার হবে না এবং প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো সমান সুযোগ পাবে। যদি রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আন্তরিক হয়, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা যায়, আইনের শাসন কার্যকর থাকে এবং আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আসে, তাহলে ভবিষ্যতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজনীয়তা স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে।
আপিল বিভাগের সাম্প্রতিক রায় তাই কেবল একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থার পুনর্বহাল নয়; এটি বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবারও সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, আদালতের রায়কে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক সংঘাত সৃষ্টি না করে এমন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে জনগণের ভোটাধিকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা এবং সংবিধানের মর্যাদা সমানভাবে সুরক্ষিত থাকবে। কারণ গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি কোনো একক প্রতিষ্ঠান নয়; বরং জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত কার্যকারিতার মধ্যেই তার সাফল্য নিহিত।
এখানে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা স্মরণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থার সংকট কখনোই শুধু আইনগত সংকট ছিল না; এটি মূলত দায়িত্বশীলতা ও আস্থার সংকট। একটি নির্বাচন তখনই গ্রহণযোগ্য হয়, যখন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলো ফলাফল বিশ্বাস করার মতো পরিবেশ পায়। সেই পরিবেশ তৈরির জন্য শুধু আইনি বিধান নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা।
অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি আস্থার ঘাটতি থেকেই নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি বারবার জোরালো হয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল কমিশনের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনে নানা সীমাবদ্ধতা। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের কার্যকারিতা–দুই বিষয়কে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং গণতান্ত্রিক নির্বাচন নিশ্চিত করার দুটি ভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক পন্থা হিসেবে দেখা উচিত। ভবিষ্যতে যদি রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে অধিকতর স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও নিরপেক্ষ করতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা সম্ভব হয়, তাহলে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কও ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাতে পারে। সেই পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে জনগণের ভোটাধিকার এবং নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজন হবে রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছা।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক
- বিষয় :
- বদিউল আলম মজুমদার