ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাক্ষাৎকার : আনু মুহাম্মদ

গণঅভ্যুত্থান সমাজের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষাগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে

গণঅভ্যুত্থান সমাজের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষাগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে
×

আনু মুহাম্মদ

ইফতেখারুল ইসলাম

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

লেখক ও গবেষক আনু মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা প্রণয়ন ও যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ মঞ্চে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। বর্তমানে ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সাধারণ সম্পাদক (১৯৮৪-৯৩) এবং তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব (২০০৫-২০) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সমকালের সহসম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম।

সমকাল: গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর আপনার কী মনে হয়, এর মধ্য দিয়ে আমরা কিছু অর্জন করেছি?

আনু মুহাম্মদ: গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে নিপীড়ন বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের বিভিন্ন অংশের প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে যেভাবে সবাই সজাগ হয়ে উঠলেন–তার মধ্য দিয়ে একটি আকাঙ্ক্ষা দেখা দেয়। সেটি হলো এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করা, যা স্বৈরতন্ত্রকে রক্ষা না করে গণতান্ত্রিক হবে, বৈষম্যহীন হবে, নিপীড়ন ও আধিপত্য থেকে মুক্ত হবে এবং যার ফলে একটি মর্যাদাপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ গড়ে উঠবে। এই প্রত্যাশাগুলো কোনো নির্দিষ্ট ঘোষণা আকারে না থাকলেও দেয়ালের গ্রাফিতির মাধ্যমে জনগণের আকাঙ্ক্ষা হিসেবে বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল। আমি মনে করি, দেয়ালের গ্রাফিতি আমাদের এই 
গণঅভ্যুত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা।

সমকাল: গ্রাফিতির মূল বার্তা কী ছিল?

আনু মুহাম্মদ: দেয়ালের গ্রাফিতিতে ছিল সব রকম বৈষম্যবিরোধী বার্তা, শ্রেণি-ধর্ম-জাতি-লিঙ্গীয় সব রকম বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা, ছবি, নিপীড়ন-
খবরদারি থাকবে না; অন্য দেশের আধিপত্যবিরোধী বার্তা। দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার– সংগঠন করা, কথা বলা, কাজ করা, গান গাওয়া, নির্বাচন–সবকিছুর অধিকার থাকবে। সব ধর্ম, লিঙ্গ ও জাতির মানুষের সমমর্যাদা থাকবে এবং কোনো শ্রেণিবৈষম্য থাকবে না। এ ধরনের আকাঙ্ক্ষাগুলোই দেয়ালে প্রকাশিত হয়েছিল। যখন মানুষ জীবন দেয়, আন্দোলন-সংগ্রাম করে তখন প্রত্যাশাও বাড়ে। তারপরও যদি বকেয়া মজুরি নিয়ে আন্দোলন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নানা সমস্যা কিংবা চাঁদাবাজির মতো বিষয়গুলো চলতে থাকে তখন তা মানুষকে খুব হতাশ করে। মানুষ ভাবে, তবে কি কোনো পরিবর্তনই হলো না? আমরা নতুন করে কী পেলাম? 

সমকাল: আমাদের সমাজকাঠামো বা দীর্ঘদিন ধরে আমরা যে ধরনের রাজনৈতিক অর্থনীতির মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছি, তাতে এই আকাঙ্ক্ষা কতটা যৌক্তিক?

আনু মুহাম্মদ: না, প্রত্যাশা বা আকাঙ্ক্ষা যেগুলো তৈরি হয়েছিল, সেগুলো তো কোনো জমাটবাঁধা রূপ নেয়নি। সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে সেগুলো নানাভাবে এসেছে। শেখ হাসিনা যেভাবে দেশ বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালিয়েছেন, যেভাবে নিপীড়ন বা দমনপীড়ন চলেছে, সেভাবে যেন আর না চলে–তা খুব বড় কোনো প্রত্যাশা ছিল না। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পরের ঘটনাগুলো প্রত্যাশা থেকে অনেক দূরে চলে গেছে। শুরু থেকেই গণঅভ্যুত্থানকে কলঙ্কিত করে সহিংসতা, নৈরাজ্য, লুটপাট, আক্রমণ, ভাঙচুর, মব সন্ত্রাস দেখা যায়। ক্রমে বিশেষ করে সাংস্কৃতিক জগতের ওপর আক্রমণ বেড়ে যায়। গান, বাউল, মাজার, ছবি আঁকা, নাচ, নাটক, ভাস্কর্য, থিয়েটার, চলচ্চিত্র–বাংলাদেশের মানুষের যত সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি রয়েছে, তার প্রতিটি আক্রান্ত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চিহ্নের ওপরও আক্রমণ হয়েছে। এই ঘটনাগুলো তো নিশ্চিতভাবে গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল না। আন্দোলনের জোয়ারে এ রকম কোনো বক্তব্যই আসেনি যে মুক্তিযুদ্ধের চিহ্ন বা সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি আক্রান্ত হবে কিংবা নাচ-গান বন্ধ হয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, হাসিনা আমলের মতো জনস্বার্থবিরোধী অর্থনৈতিক নীতি এবং চুক্তির ধারাও অব্যাহত রাখা হয়েছে। 

সমকাল: গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অনাকাঙ্ক্ষিত 
ঘটনাগুলোর দায় কার?

আনু মুহাম্মদ: এ দায় যারা করেছে প্রথমত তাদের, এরপর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের। সেখানে যারা ছিলেন তাদের সবাইকে এসবের দায় নিতে হবে। তরুণ, বৃদ্ধ, বাংলাদেশি, বিদেশি যারাই ছিলেন সবাইকে নিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার এবং এরপরে যারা নির্বাচিত হয়ে এসেছে, তাদের দায়িত্ব ছিল এটা নিশ্চিত করা যে তারা হাসিনার সরকারের আমলের বিভিন্ন অপশাসন থেকে দূরে সরে আসবে।

সমকাল: গণঅভ্যুত্থানের অর্জন তাহলে কী?

আনু মুহাম্মদ: গণঅভ্যুত্থানের প্রধান অর্জন তো একটি অত্যাচারী শাসকের পতন। অবশ্যই নির্বাচন হয়েছে এবং কিছু বিচার হচ্ছে, এগুলোও অর্জন। একটা জগদ্দল পাথর গেছে কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশকে দাঁড় করাতে আরও অনেক কাজ বাকি। 

সমকাল: তরুণদের অনেকে অভিযোগ তুলছেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী স্বপ্নভঙ্গের দায় তরুণদের ওপর চাপানো হচ্ছে?

আনু মুহাম্মদ: তরুণদের কেন দায়ী করা হবে? তরুণ বলে তো কোনো একক গোষ্ঠী নেই। যারা অন্তর্বর্তী সরকারে ছিল, প্রধান দায় তাদের। এর ভেতরে-বাইরে তরুণ-প্রবীণ যারাই এতে সায় বা পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন, সবারই দায় নিতে হবে। তারা তো হাসিনার আমলের মতো সবাইকে অন্ধকারে রেখেই চুক্তিগুলো করেছেন। বন্দর নিয়ে চুক্তি, স্টারলিংক চুক্তি, এলএনজি আমদানি চুক্তি এবং নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভয়াবহ বাণিজ্য চুক্তি–এসবের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি ভয়াবহ বিপদের মধ্যে তারা ফেলে দিয়েছেন। হাসিনা আমলের যত ক্ষতিকর চুক্তি ও জনগণের সঙ্গে প্রবঞ্চনা ছিল, সেগুলো অব্যাহত রাখা হয়েছে এবং এ রকম কোনো চুক্তি বাতিলের পথই তৈরি করা হয়নি। 
সমকাল: শেখ হাসিনার আমলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক গণবিরোধী চুক্তি হয়েছিল বলে লোকেমুখে শুনি, কিন্তু এখনও কোনো সরকার এগুলো জনসমক্ষে আনে না কেন?
আনু মুহাম্মদ: দুই সরকারকেই এই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। 

সমকাল: এই হতাশার পেছনে রাজনৈতিক দলগুলোর দায় কীভাবে মূল্যায়ন করেন? 

আনু মুহাম্মদ: এই যে বন্দর নিয়ে চুক্তিগুলো করা হলো, সেগুলো শেখ হাসিনার আমলের চুক্তির কাঠামোতেই করা হয়েছে, কোনো পরিবর্তন হয়নি। মানুষ তো চেয়েছিল শেখ হাসিনার কাজের ধরন থেকে কিছু পরিবর্তন আসুক, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আসবে। সেভাবে তা করা হয়নি। উল্টো বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, যে দলগুলো গণঅভ্যুত্থানকে ধারণ করে বলে দাবি করে, যারা সংসদের সরকারি দল, বিরোধী দল, পুরোনো ও নতুন দল–সবাই ভয়াবহ মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির পক্ষে নীরবতা দিয়ে সম্মতি দিচ্ছে। এ দলগুলো নিজেদের মধ্যে কথাকাটাকাটি বা গালাগালি করছে, কিন্তু এই চুক্তিগুলো নিয়ে বাইরে যখন প্রতিবাদ হচ্ছে, তখন তারা একদম নির্বাক। এই ঐক্যবদ্ধ নীরবতা সত্যিই বিস্ময়কর। 

সমকাল: তাহলে দায় প্রধানত ক্ষমতায় যারা ছিল তাদের?

আনু মুহাম্মদ: এটা তো বটেই। ক্ষমতা যাদের হাতে থাকে, দায়িত্ব তো তাদেরই নিতে হবে। যেমন ধরেন, যে ভাঙচুর বা মব সন্ত্রাস হলো–এমনকি ছায়ানট, উদীচী, প্রথম আলো, ডেইলি স্টার বা বাউলদের ওপর যে আক্রমণ হলো–এগুলোর জন্য যারা আক্রমণ করেছে এবং যারা উস্কানি দিয়েছে তারাই দায়ী। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল এগুলো শক্ত হাতে থামানো, কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ সরকার নেয়নি। এখন যে নির্বাচিত সরকার এসেছে, তারা এই কাজগুলো কারা করছে এবং ভবিষ্যতে যাতে না হয়, সেটার জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার–এ ব্যাপারেও যথাযথ উদ্যোগ নেয়নি। কারা উস্কানি দিচ্ছে, ফেসবুকে বা দেশ-বিদেশ থেকে কে কী বলছে, তার তো সব রেকর্ড আছে। আজকাল সবই জানা যায়। 

সমকাল: বিশেষত লিবারেল-সেক্যুলার 
বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ গণঅভ্যুত্থানকে ব্যর্থ বলছেন। আপনি কী মনে করছেন? 

আনু মুহাম্মদ: সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ভর করে আপনি কী চাচ্ছিলেন এবং আপনার লক্ষ্য কী ছিল তার ওপর। গণঅভ্যুত্থানের প্রধান লক্ষ্য ছিল অত্যাচারী সরকারের পতন, যা অর্জিত হয়েছে। কাজেই একে ব্যর্থ বলা যায় না। শুধু এইটুকু বলা যায়, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে সম্ভাবনা ও জনগণের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। বরং উল্টো দিকে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পিত চেষ্টা আছে। 

সমকাল: কেন পূরণ হয়নি?

আনু মুহাম্মদ: তার কারণও আছে, এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। আগে বললাম, শ্রেণিবৈষম্য, জাতিগত, ধর্মীয় ও লিঙ্গীয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে আকাঙ্ক্ষাগুলো দেয়ালের গ্রাফিতিতে পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছিল। এই বৈষম্যগুলো দূর বা কমানোর জন্য যে ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, মতাদর্শিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগের প্রয়োজন, তা নেওয়া হয়নি। কারণ বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার মতো আদর্শে বিশ্বাসী রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তির সমাবেশ বাংলাদেশে এখনও অনেক দুর্বল। বরং ধর্মীয়, জাতিগত, লিঙ্গীয় ও শ্রেণিবৈষম্যের ওপর ভিত্তি করে যারা রাজনীতি করেন, তারাই এ দেশে এখন পর্যন্ত সংগঠিত শক্তি। ফলে কেবল আকাঙ্ক্ষা করলেই তো হবে না, বাস্তব অবস্থা এটাই ছিল যে একটি অত্যাচারী শাসকের পতন এবং নির্বাচন অনুষ্ঠান ছাড়া সেই মুহূর্তে বড় কোনো রূপান্তরের বাস্তব ভিত্তি বা শক্তি সমাবেশ ছিল না। যারা এই দেশের জন্য স্বপ্ন দেখেন এবং লড়াই করেন, তাদের দায়িত্ব তাই এখনও শেষ হয়ে যায়নি; অবসর হবে না।

সমকাল: সমাজে দীর্ঘদিন ধরে যে ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তা কি এত দ্রুত উল্টে ফেলা সম্ভব?

আনু মুহাম্মদ: না, এগুলো রাতারাতি হবে না। সেই পথে তো যেতে হবে, উল্টো দিকে গেলে তো হবে না। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সমাজে নড়াচড়া হয়েছে, যে আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশাগুলো উচ্চারিত হয়েছে, দেয়ালে ফুটে উঠেছে, তা অত্যন্ত ইতিবাচক ঘটনা। একে এই হিসাবে দেখা উচিত যে আমাদের কোন দিকে যাওয়া উচিত এবং সমাজে ঠিক কোন আকাঙ্ক্ষাটা সুপ্ত রয়েছে–তা এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে। তাই এই আকাঙ্ক্ষাকে বাড়াবাড়ি না বলে খুব ইতিবাচকভাবে নেওয়া উচিত। সমাজে যে প্রত্যাশা আছে, তা পূরণের জন্য এখন কী ধরনের সাংগঠনিক, রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক কাজ আমাদের করতে হবে, সেই তাগিদটাই এই আকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে তৈরি হয়ে গেছে।

সমকাল: গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের চালানো হত্যাযজ্ঞের বিচার নিয়ে বিএনপি সরকার কতটা আন্তরিক ও দায়িত্বশীল আচরণ করছে? সংখ্যা নিয়ে এখনও বিভ্রান্তি কেন?

আনু মুহাম্মদ: নিহতের হিসাব করতে এত দিন লাগার কথা না–এক মাস বা দুই মাসের মধ্যে এটা স্পষ্ট হওয়া উচিত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ই এর একটি বড় সুযোগ চলে গেছে। সরকারের হিসাবে এখন নিহতের সংখ্যা আটশর কিছু বেশি আর জাতিসংঘের হিসাবে এক হাজার ৪০০। এই পার্থক্য কেন হলো, তা আমার বোধগম্য নয়। দেশের যে প্রশাসনিক কাঠামো আছে, তার মাধ্যমে থানা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে খোঁজ নিলেই তো জানা সম্ভব ছিল তখন কতজন নিহত বা আহত হয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম দু-তিন মাসের মধ্যেই এই কাজটা হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। তখন আহতদের চিকিৎসাসহ সঠিক তালিকা তৈরির কাজটাও ঠিকমতো হয়নি। এখন যে সরকার ক্ষমতায় আছে, এটি তাদের দায়িত্ব। বিচার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে এবং রায়ও হচ্ছে। এটি যাতে যথাযথভাবে হয়, সেদিকে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবার আরও মনোযোগ দেওয়া উচিত।

সমকাল: বিচার প্রক্রিয়ায় কী কী বিষয় গুরুত্ব দেওয়া দরকার?

আনু মুহাম্মদ: বিশেষ করে সরকারের একটি বিষয়ে বিশেষভাবে নজর দেওয়া উচিত, তা হলো বিনাবিচারে বা মিথ্যা মামলায় লেখক-শিল্পীসহ বহু মানুষকে আটক রাখা হয়েছে। আটক বাণিজ্য বা হয়রানিমূলক মামলা হওয়ার খবরও শোনা যাচ্ছে। ভুয়া ও হয়রানিমূলক মামলা থাকলে বিচার প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সরকারের উচিত অবিলম্বে এই মিথ্যা মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নেওয়া এবং প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত ও এমন স্বচ্ছতার সঙ্গে বিচার করা, যাতে তা কোনো ধরনের বিতর্কের মুখে না পড়ে। বিচার প্রক্রিয়ার এই 
গ্রহণযোগ্যতাই ইতিহাসের কাছে এই সরকারের সঠিক অবস্থান নিশ্চিত করবে।

সমকাল: গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী গঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুনত্ব এবং গণমুখী রাজনীতির বিশেষ কোনো লক্ষণ কি চোখে পড়ছে? 

আনু মুহাম্মদ: প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের চলাফেরা, পোশাক, আচার-আচরণ ও কথাবার্তা যথেষ্ট সরল এবং পরিশীলিত। তিনি তাঁর স্ত্রী ও কন্যাকে জনসমক্ষে গুরুত্ব দিচ্ছেন, সেটিও আমি মনে করি প্রশংসাযোগ্য। দেশে স্কুলসহ বিভিন্ন পর্যায়ে ছেলেমেয়ে উভয়ের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক তৎপরতায় উৎসাহ দিচ্ছেন, সেটিও ভালো ঘটনা। কিন্তু অর্থনৈতিক নীতি বা রাজনৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আমরা দেখছি না। অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রে ঠিক আগের মতোই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার বা এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের গৃহীত অর্থনৈতিক নীতিই বহাল আছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি কিংবা বড় বড় করপোরেট গ্রুপ; যারা বাংলাদেশের অর্থনীতি পরিচালনা করে, তাদের আধিপত্যই বলবৎ রয়েছে। চুক্তিগুলো অপরিবর্তিত থাকায় কার্যক্রমে অস্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব আমরা দেখতে পাচ্ছি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে। সরকারি রাজনৈতিক দলের কর্মীদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন জায়গায় নানা অভিযোগ আসছে।

সমকাল: এই সরকারের মাত্র পাঁচ মাস পার হলো। আগামী দিনে এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা কি রয়েছে?

আনু মুহাম্মদ: সরকারের পথচলার এই সময়ে পুরোপুরি কোনো সিদ্ধান্তে আসা ঠিক হবে না, তবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলো সরকারের নিজেরই কঠোর পর্যালোচনার মধ্যে রাখা উচিত। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের দায়িত্ব অনেক বেশি। যদি এই প্রক্রিয়া উন্মুক্ত পর্যালোচনার আওতায় না আসে, তবে পুরোনো ধারা ও নীতিগুলোরই পুনরাবৃত্তি হতে থাকবে। শেখ হাসিনা আমলের যে অর্থনৈতিক নীতিকাঠামোর কারণে লুটপাট, সম্পদ পাচার, বৈষম্য, বেকারত্ব এবং পরিবেশ ধ্বংস ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছিল, সেই একই কাঠামো যদি বজায় থাকে, তবে দেখা যাবে আবারও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। 

সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। 

আনু মুহাম্মদ: আপনাকেও ধন্যবাদ। 

আরও পড়ুন

×