মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের হিসাবনিকাশ
এম হুমায়ুন কবির
এম হুমায়ুন কবির
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১১:০৬
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মতো গুরুত্বপূর্ণ শক্তির সমন্বয়ে সম্পাদিত ‘মক্কা এগ্রিমেন্ট’ বা ‘মক্কা প্যাক্ট’ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গন এবং আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এক নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। দেশের নীতিনির্ধারক ও সুশীল সমাজেও একটি কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে– উদীয়মান এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু, এবং বাংলাদেশ এতে যুক্ত হলে তার সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে? কোনো বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক জোটে ঢোকার আগে আমাদের জাতীয় স্বার্থের সমীকরণ, পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের বহুমাত্রিক দিকগুলো অত্যন্ত নিবিড় ও বস্তুনিষ্ঠভাবে খতিয়ে দেখা অপরিহার্য।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং বিশ্বস্ত সূত্রের পর্যালোচনায় এটা স্পষ্ট, তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব যৌথভাবে মধ্যপ্রাচ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ দেশ ইরানকেও এই উদীয়মান ব্লকে অন্তর্ভুক্তির জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আহ্বান ও আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এ থেকে এটি প্রতীয়মান– এই জোট মূলত একটি ‘আমন্ত্রণভিত্তিক’ কাঠামো বা ফ্রেমওয়ার্কের ওপর গড়ে উঠছে। জোটের উদ্যোক্তা দেশগুলো ঐকমত্যের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক দাওয়াত দিলেই কোনো রাষ্ট্র এই জোটে ঢুকতে পারবে। আমরা জানি, বাংলাদেশ এখনও মক্কা জোটের উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে কোনো অফিসিয়াল বা ফরমাল আমন্ত্রণ পায়নি। তাই এ জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া বা না দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত ধারণা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ একেবারেই কাল্পনিক ও অপ্রাসঙ্গিক।
হতে পারে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এ আমন্ত্রণ পেতে পারে। তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কূটনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের বেশ কয়েকটি স্পর্শকাতর ও মৌলিক বিষয় সম্পর্কিত গভীর উদ্বেগ বিবেচনায় রাখতে হবে। স্বাধীনতার পর থেকে গত প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি সুনির্দিষ্ট ও প্রশংসনীয় নীতিগত অবস্থান ধরে রেখেছে। জাতিসংঘের সার্বিক তত্ত্বাবধান ও সমন্বয়ে পরিচালিত শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের বাইরে বাংলাদেশ কখনোই নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনীকে অন্য কোনো বহুপক্ষীয় সামরিক জোট বা সামরিক ব্লকে যুক্ত করেনি। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক মূলমন্ত্রই হচ্ছে– ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’। এই নীতি কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দীর্ঘ অনুশীলনের অংশ।
আমাদের এই নীতিগত অবস্থানের এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। পাকিস্তান আমলে যখন মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অক্ষ ‘সেনটো’ ও ‘সিয়াটো’ গঠিত হয়েছিল এবং তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাতে যোগ দিয়েছিল; তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) এর তীব্র বিরোধিতা করেছিল। সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বের কারণে আওয়ামী লীগ দলগতভাবে এর বিরোধিতা না করলেও দলটির বহু নেতা এর বিরোধী ছিলেন। মূলত ওই আবেগ ও অনুভূতির ধারাবাহিকতা রক্ষার্থেই স্বাধীনতার পর ‘জোটনিরপেক্ষ’ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা হয়। দীর্ঘ ৫৫ বছরের এই ঐতিহ্যবাহী অসামরিক ও জোটনিরপেক্ষ নীতিগত অবস্থান কি একটি নতুন আমন্ত্রণের ওপর ভিত্তি করে পরিবর্তন করা সমীচীন হবে? এটি এমন এক প্রশ্ন, যার সঙ্গে দেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ যুক্ত এবং যার জন্য বিশাল আকারের জাতীয় ঐকমত্য ও সমন্বিত বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
আমাদের আরও গভীরে গিয়ে দেখতে হবে মক্কা প্যাক্টের আসল প্রকৃতি ও রূপরেখা ঠিক কী রকম। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি এক বক্তব্যে বলেছেন, এ চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী তিন দেশের কোনো একটি দেশ যদি বহিরাগত কোনো শক্তির দ্বারা আক্রান্ত হয়, তবে অন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো ধরে নেবে যে, এটি তাদের সবার ওপরেই আক্রমণ। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা একে উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থার (ন্যাটো) বিখ্যাত ‘আর্টিকেল ৫’ বা যৌথ প্রতিরক্ষানীতির সরাসরি অনুকরণ হিসেবে দেখছেন।
যদি মক্কা প্যাক্ট বাস্তবিকই এমন একটি যৌথ সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি হয় এবং এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য যদি কেবল সামরিক সুরক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এতে যুক্ত হওয়া কতটা লাভজনক বা সুবিধাজনক হবে– সে প্রশ্নও তৈরি হয়। তা ছাড়া ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে মধ্যপ্রাচ্যের ওই তিনটি দেশের সঙ্গে আমাদের সরাসরি কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা স্থলপথের সংযোগ নেই। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা যেখানে অত্যন্ত সুস্পষ্ট, সেখানে এই সামরিক জোটের আওতায় বাংলাদেশের আঞ্চলিক কৌশলগত সংযোগ বা প্র্যাকটিক্যাল কানেক্টিভিটি কীভাবে অর্জিত হবে এবং বাংলাদেশ এতে কীভাবে সামরিকভাবে লাভবান বা সুরক্ষিত হবে– তা এক বিশাল কৌশলগত সংশয় তৈরি করে।
এটা সত্য, সৌদি আরবে আমাদের লাখ লাখ অভিবাসী শ্রমিক কর্মরত, যা আমাদের রেমিট্যান্সের মূল চালিকাশক্তি; তুরস্কের সঙ্গে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সুসম্পর্ক বিদ্যমান; পাকিস্তানের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে। কিন্তু যদি দ্বিপক্ষীয় স্তরে আমাদের এই স্বার্থগুলো স্বাভাবিক নিয়মেই রক্ষিত হয়, নতুন একটি বহুপক্ষীয় সামরিক জোটে যুক্ত হয়ে আমরা অতিরিক্ত কী অর্জন করব? তদুপরি এই জোটে যুক্ত হলে আমাদের ওপর বড় কোনো কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি নেমে আসতে পারে কিনা, সেটাও ভাবতে হবে। বাংলাদেশ এমন এক ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় অবস্থান করছে, যেখানে এশীয় ও বৈশ্বিক অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শক্তি যেম ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আমাদের ভারসাম্যপূর্ণ ও গঠনমূলক কূটনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের রপ্তানি বাণিজ্য, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঋণ এবং ভূ-রাজনৈতিক স্থায়িত্ব এই বহুমাত্রিক অংশীদারদের ওপর নির্ভরশীল। তাই মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক একটি সুনির্দিষ্ট সামরিক অক্ষের সঙ্গে যুক্ত হলে আমাদের অন্য বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশীদাররা তা কীভাবে গ্রহণ করবে এবং তাদের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি মৌলিক জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত বা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হবে কিনা– তা গভীরভাবে তলিয়ে দেখতে হবে।
মোদ্দা কথা, মক্কা প্যাক্ট বা এ ধরনের যে কোনো নতুন বৈশ্বিক জোটের বিষয়ে আবেগের বশে বা তড়িঘড়ি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া রাষ্ট্রীয় দূরদর্শিতার পরিচায়ক হবে না। যে কোনো চুক্তির চূড়ান্ত রূপরেখা, সুবিধা-অসুবিধা, জাতীয় নিরাপত্তার ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে। সর্বোপরি জাতীয় ঐকমত্য, ভূ-রাজনৈতিক সচেতনতা এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে অগ্রাধিকার দিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এম হুমায়ুন কবির: সাবেক রাষ্ট্রদূত
- বিষয় :
- মক্কা চুক্তি
- বাংলাদেশ
- সামরিক শক্তি