বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
রাজনীতি, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং সরকারের চ্যালেঞ্জ
ফাইল ছবি
শায়রুল কবির খান
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০০:০৮ | আপডেট: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:১৭
দেশের নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার সব প্রতিশ্রুতি ইতিবাচকভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। যেমন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমদানিনির্ভর নীতিতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে যে মাফিয়াতন্ত্র তৈরি হয়েছিল, তার পরিস্থিতির বাস্তব চিত্রটি এখন দৃশ্যমান। সঙ্গে অর্থ পাচার, ব্যাংক থেকে অবৈধভাবে নেওয়া ঋণের চাপ এবং লাগামহীন লুটপাটের ফলে আজকের অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। তা সত্ত্বেও পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারের চেষ্টা অব্যাহত।
এটা ঠিক, নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য এবং সার ও জ্বালানি সরবরাহে ত্রুটির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের পাশাপাশি দলের রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দের জনসম্পৃক্ততা অত্যন্ত জরুরি। জনসম্পৃক্ত কর্মসূচিও দরকার।
দেশের অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা কাটিয়ে ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণভার সামলে বিএনপি সরকার দেশ পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করছে। পাশাপাশি, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূলে একাধিক প্রার্থী সামলানো বিএনপির জন্য এক বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই তাদেরকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে। যে কোনো সংকট উত্তরণে বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে তীক্ষ্ণ ও বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল অবলম্বন করার বিকল্প নেই।
জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির রাজনৈতিক লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কর্মসূচির সাথে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্র দলগুলোর রাজনৈতিক লক্ষ্য ও চাহিদার মৌলিক তফাৎ রয়েছে। এই তফাৎটি সাধারণ জনগণ দুইভাবেই উপলব্ধি করছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন।
উল্লেখ্য, বিগত একতরফা আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জাতীয় সংসদে বিরোধী দল হিসেবে ছিল জাতীয় পার্টি। অন্যদিকে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর যাবৎ গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পাওয়ার আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। এই সংগ্রাম, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং জন-আকাঙ্ক্ষার তফাৎটি সবার কাছেই পরিষ্কার।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিপুল আত্মত্যাগ এবং সুদূর লন্ডন থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ১৭ বছরের নিরলস প্রচেষ্টা এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ এবং দেশব্যাপী প্রায় ৬০ লাখ নেতাকর্মী মামলার আসামি হয়েছেন; অনেকে খুন ও গুমের শিকার হয়েছেন।
যুগপৎ আন্দোলনে শরিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দের ওপর নিপীড়ন, নির্যাতন, মামলা ও হামলার মধ্য দিয়ে অবশেষে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে।
এই পর্যায়ে, বিএনপি প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছরে, দলের প্রয়োজনে ও দেশের কল্যাণে এবং রাজনীতিকে শক্তিশালী করতে সর্বস্তরে দ্রুত গোপন ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব তৈরি করা দরকার। তাতে দল, সরকার ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে, যাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ‘অনিবার্য বাস্তবতা’ হিসেবে দেখেন। দলটির রয়েছে ঐতিহাসিক ভিত্তি ও সুদীর্ঘ জনসমর্থন। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিএনপি দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়েছে। দেশের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত দলটির ব্যাপক কর্মী-সমর্থক ও সুসংহত অবকাঠামো রয়েছে, যা যেকোনো জাতীয় নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত রাজপথের ওপর নির্ভর করে। ঘরকুনো অবস্থান নিয়ে কোনো সরকারি দল বা বিরোধী দল রাজপথ জমাতে পারবে না। বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ঘোষণা দিয়েছিলেন— তারা রাজপথে সভা-সমাবেশ করবেন না। এর মূল অর্থ ছিল, যেহেতু আওয়ামী লীগ সভা-সমাবেশ করবে না, সেহেতু বিএনপিকেও সে সুযোগ দেওয়া হবে না। মাঝখান থেকে প্রশাসনযন্ত্র ব্যবহার করে ক্ষমতার মাঠটা আওয়ামী লীগের দখলে রাখাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য।
এটাই ছিল আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় ‘অপকৌশল’। কিন্তু বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার গৌরবোজ্জ্বল স্বীকৃতি যে বিএনপির রয়েছে, তাদের ওপর দমন-পীড়ন, হামলা-মামলা, হত্যা ও গুমের মতো নিষ্ঠুরতম অত্যাচার চালিয়েও কি শেষ রক্ষা হয়েছে? আওয়ামী লীগের শেষ পরিণতি কী হয়েছে—তা আজ দৃশ্যমান।
বিএনপি এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে দল ও সরকার পরিচালনা করবে এবং ৩১-দফার ভিত্তিতেই আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণ করবে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটাই প্রত্যাশা।
শায়রুল কবির খান: সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী
- বিষয় :
- বিএনপি
- প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী