অন্যদৃষ্টি
সেবাভিত্তিক রাষ্ট্র কবে হবে
সাজ্জাদ সাব্বির
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
সিফাত একজন তরুণ তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী। কয়েক দিন আগে তাঁর বাবা ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। একই সময়ে তাঁর বোন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। চিকিৎসকরা দুজনকেই আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। জীবনের সবচেয়ে অসহায় সময়ে সিফাত হাসপাতালের তালিকা খোঁজার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচিতজন খুঁজতে শুরু করেন। তাঁর চেষ্টা ছিল, যদি কোনো একজন পরিচিত ভাইকে ধরে ঢাকা মেডিকেল বা কোনো সরকারি হাসপাতালে একটি আইসিইউ ম্যানেজ করা যায়।
শেষ পর্যন্ত সিফাত আইসিইউ ম্যানেজ করতে পারেননি। বাবাকে চার দিন একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে রাখলেও তাঁকে আর ফেরানো যায়নি। বোন অবশ্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। কিন্তু চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে ত্রিশের কোঠায় থাকা এই তরুণ তাঁর প্রায় সব সঞ্চয় শেষ করেছেন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ঋণ।
বাংলাদেশে এমন ঘটনার শিকার শুধু সিফাত নন। তাঁর মতো হাজারো মানুষ প্রতিদিন একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এই গল্পগুলো আসলে আমাদের রাষ্ট্রীয় সেবা ব্যবস্থার একটি বড় চিত্র তুলে ধরে। একজন নাগরিকের চিকিৎসা পাওয়া, পাসপোর্ট করা, জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন, মামলা করা, ড্রাইভিং লাইসেন্স নেওয়া কিংবা একটি সরকারি সনদ সংগ্রহ কি নাগরিকের অধিকার হিসেবে পাওয়া উচিত নয়?
রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোর একটি হলো সেবা। নাগরিক কর দেন, আইন মানেন এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো চালানোর অর্থ ও বৈধতা দেন। বিনিময়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিককে নিরাপত্তা, বিচার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সেবা দেওয়া।
বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন। সরকারি অফিসে ফাইলের স্তূপ, দীর্ঘ অপেক্ষা, অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র, কর্মকর্তার দুর্ব্যবহার, ঘুষের অভিযোগ এবং পরিচিতি ছাড়া কাজ না হওয়ার সংস্কৃতি নাগরিককে রাষ্ট্রের কাছ থেকেই দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। প্রশ্নটা তাই খুব সাধারণ। রাষ্ট্রীয় সেবা কি ক্ষমতা বা পরিচিতির ওপর নির্ভর করবে?
একজন নাগরিকের আইসিইউ পাওয়ার জন্য যদি রাজনৈতিক পরিচিতির প্রয়োজন হয়, তাহলে এটিকে শুধু স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। তা রাষ্ট্রীয় সক্ষমতারও বড় সংকট। একইভাবে পাসপোর্টের কাজ দ্রুত করাতে যদি পরিচিত কর্মকর্তার প্রয়োজন হয়; থানায় অভিযোগ করতে যদি রাজনৈতিক সুপারিশ লাগে কিংবা ভূমি অফিসে একটি ফাইল নড়াতে যদি মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন হয়,
তাহলে বুঝতে হবে সেবা আর নাগরিকের অধিকার হিসেবে কাজ করছে না। সেটি হয়ে যাচ্ছে ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল একটি ব্যবস্থা।
রাষ্ট্রের কাজ নাগরিকের জীবন সহজ করা। একজন মানুষ যেন অসুস্থ বাবা বা মাকে নিয়ে আইসিইউ খুঁজতে গিয়ে রাজনৈতিক পরিচিতি খুঁজতে বাধ্য না হন।
সরকারি অফিসে গিয়ে যেন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অনুগ্রহের অপেক্ষা করতে না হয়। নিজের অধিকার পাওয়ার জন্য যেন কোনো মধ্যস্থতাকারীর কাছে যেতে না হয়।
একটি আধুনিক রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সেবা ব্যবস্থা তৈরি, যেখানে নাগরিককে প্রশ্ন করা হবে না– ‘কাকে চেনেন?’ বরং প্রশ্ন হবে– ‘আপনার কী সেবা প্রয়োজন?’
সিফাতের বাবাকে আমরা ফিরিয়ে দিতে পারব না। তাঁর পরিবারের ঋণও রাষ্ট্র মুছে দিতে পারবে না। কিন্তু সিফাতের গল্প থেকে যদি আমরা শিক্ষা নিতে পারি এবং এমন একটি রাষ্ট্রীয় সেবাব্যবস্থা তৈরি করতে পারি, যেখানে পরবর্তী কোনো তরুণকে তাঁর বাবার জন্য একটি আইসিইউ পেতে রাজনৈতিক পরিচিতি খুঁজতে না হয়, তাহলে হয়তো এই বেদনাদায়ক গল্পের একটি অর্থ তৈরি হবে।
রাষ্ট্রীয় সেবা কোনো দয়া নয়। এটি নাগরিকের অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।
সাজ্জাদ সাব্বির: কেন্দ্রীয় সদস্য, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি