ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিবাহের নামে চীনযাত্রা

প্রতিকার অপেক্ষা প্রতিষেধক উত্তম

প্রতিকার অপেক্ষা প্রতিষেধক উত্তম
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

পাঁচ বৎসরে চার সহস্রাধিক বাংলাদেশি নারীর কিউ-১ ভিসা লইয়া চীনে গমনের খবরটি উদ্বেগজনক বটে। সম্প্রতি এই সংখ্যা প্রকাশিত হইয়াছে মানব পাচার রোধ লইয়া কর্মরত সংস্থা ‘জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার বাংলাদেশ’ আয়োজিত এক কর্মশালায়। চীনযাত্রী নারীর কতজন পাচারের শিকার হইয়াছেন, তাহা স্পষ্ট নহে। তবে বিপুল সংখ্যক নারীকে কেন ‘পারিবারিক মিলন’ ভিসা লইয়া চীনে যাইতে হইতেছে, উহা সন্দেহজনক। পাচারের সন্দেহ অধিক ঘনীভূত হইয়াছে চীনের ‘এক সন্তান নীতি’র ফলে নারীর সংখ্যা হ্রাসের ন্যায় বাস্তবোচিত পরিস্থিতিতে। স্বীকার্য, বাংলাদেশি নারীর চীনযাত্রা কিংবা ভিসা গ্রহণের সংখ্যার সহিত পাচারের অভিযোগকে অভিন্ন করিয়া দেখিবার অবকাশ নাই। কিন্তু কয়েক বৎসর ধরিয়া বিদেশি বিবাহের আড়ালে প্রতারণা, নির্যাতন ও পাচারের অভিযোগ বৃদ্ধিও উপেক্ষণীয় নহে। 

স্মরণে রাখিতে হইবে, আলোচ্য কর্মশালায় চীনযাত্রী নারীর সংখ্যা প্রকাশিত হইবার পূর্বেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিবাহের নামে চীনে নারী পাচারের খবর আমরা প্রত্যক্ষ করিতেছি।

বাগেরহাটের ১৯ বৎসর বয়সী এক নারীর চীনে পাচার হইবার অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে চাঞ্চল্য ছড়াইয়াছে, অধিক দিন হয় নাই। তাঁহাকে চাকরির প্রলোভনে ঢাকায় আনিয়া মাদক প্রয়োগ ও আপত্তিকর ভিডিও ধারণের পর এক চীনা নাগরিকের সহিত ‘বিবাহ’ দেওয়া হইয়াছিল। উহারও পূর্বে দেশের পার্বত্যাঞ্চল হইতে চীনে নারী পাচারের খবর আমাদের উদ্বেগ বৃদ্ধি করিয়াছিল। ঐ সময় জানা গিয়াছিল, এই প্রকার মানব পাচারে জনপ্রতি আট হইতে ২০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত মূল্য নির্ধারিত হইয়া থাকে। বাংলাদেশ হইতে বৈধ পথেই চীনযাত্রার নথিপত্র তৈয়ারের জন্য ঘাটে ঘাটে রহিয়াছে মাঝির যোগসাজশ। আমাদের প্রশ্ন, পাচারকারী যদি এত সহজে নথি তৈয়ার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা অতিক্রম করিতে পারে, তাহা হইলে রাষ্ট্রের নজরদারি ব্যবস্থা কোথায়?

সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ‘প্রেমের টানে’ চীনা যুবকদের বাংলাদেশের নারীর নিকট ছুটিয়া আসিবার খবরও বৃদ্ধি পাইয়াছে। এইরূপ পরিস্থিতিতে বিদেশি নাগরিকের সহিত এই দেশের নারীর বিবাহের ক্ষেত্রে ঝুঁকি-যাচাই ব্যবস্থা চালু জরুরি। প্রেমের টানে বিদেশি নাগরিক ছুটিয়া আসিলেই ‘অতিথিপরায়ণ জাতি’ হিসাবে বিহ্বল হইয়া উঠিবার অবকাশ নাই। বরঞ্চ মস্তিষ্ক স্থির রাখিয়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়, বৈবাহিক অবস্থা, পেশা, ঠিকানা ও অপরাধের ইতিহাস যাচাই করিতে হইবে। বিবাহের মধ্যস্থতাকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বৈধতা পরীক্ষা করিতে হইবে। এই ক্ষেত্রে স্থানীয় পুলিশ-প্রশাসনের সহিত কেন্দ্রীয় পুলিশি ও নজরদারি সংস্থার তথ্য আদান-প্রদানের কার্যকর ব্যবস্থা আবশ্যক। ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাস এবং বেইজিংস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের সহিতও থাকিতে হইবে ‘হট লাইন’। ইতোমধ্যে পাচারের যেই সকল ঘটনা শনাক্ত হইয়াছে কিংবা পাচারের অভিযোগ উঠিয়াছে, সেই সংখ্যা হইতে ঝুঁকির মানচিত্র তৈয়ার করিতে হইবে।

স্বীকার্য, চীন আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, তৎসহিত দুই দেশের মানুষের যোগাযোগ আরও বৃদ্ধি পাইবে। এই বাস্তবতায় বৈধ চলাচল সহজকরণ এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধ প্রতিরোধের ব্যবস্থাও শক্তিশালীকরণ জরুরি। কোনো দেশের সহিত অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর হওয়ার অর্থ নাগরিকের নিরাপত্তার প্রশ্নে ছাড় দেওয়া নহে। বিবাহ একান্তই ব্যক্তিগত সম্পর্ক। কিন্তু বিবাহের অন্তরালে যদি পাচারের পথ তৈয়ার হয়, তবে তাহা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়। তাই প্রতিরোধের ব্যবস্থা লইতে হইবে নারী পাচার হইয়া বিদেশে যাইবার পর নহে; বিদেশ গমনের পূর্বেই। প্রতিকার অপেক্ষা প্রতিষেধক উত্তম– উহা কে না জানে!
 

আরও পড়ুন

×