ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

পাসপোর্টের ক্ষমতা কেন বাড়ে-কমে

পাসপোর্টের ক্ষমতা কেন বাড়ে-কমে
×

মো. সুমন জিহাদী

মো. সুমন জিহাদী

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৫ | আপডেট: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

ফ্রান্সের শার্ল দ্য গল এয়ারপোর্টে এক কানাডিয়ান নাগরিক ইমিগ্রেশন পুলিশের দিকে তাঁর পাসপোর্ট হাসিমুখে বাড়িয়ে দিলেন। ইমিগ্রেশন পুলিশ আন্তরিকতার সঙ্গে তাঁর পাসপোর্ট গ্রহণ করে মাত্র ১ মিনিটের মধ্যেই ইমিগ্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন করে। কিছুক্ষণ পর একজন বাংলাদেশি নাগরিক সেখানে গেলে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। তাঁর পাসপোর্ট, ভিসা, হোটেল বুকিং, টিকিট, ব্যাংক সলভেন্সি, পুনরায় চেক করার পাশাপাশি নানা প্রশ্নে জর্জরিত করা হয়। 

২০২৬ সালের হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ৯৫তম। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী তিনটি পাসপোর্টই এশিয়ার। তালিকার শীর্ষে আছে সিঙ্গাপুর। দ্বিতীয় স্থানে যৌথভাবে আছে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। পাসপোর্টের ক্ষমতা মানে হচ্ছে আসলে সেই দেশের নাগরিকদের গ্রহণযোগ্যতা। সিঙ্গাপুরের নাগরিকরা বিনা ভিসায় ১৯২টি দেশে চলে যেতে পারে মন চাইলেই। এই তালিকায় আমেরিকার অবস্থান দশম। মার্কিনিরা ১৮০টি দেশে বিনা ভিসায় ভ্রমণ করতে পারে। হেনলে অ্যান্ড পার্টনার্স প্রকাশিত এই হেনলে ইনডেক্স অনুযায়ী আসলে যে দেশের পাসপোর্ট বহন করে যত বেশি দেশে বিনা ভিসায় ভ্রমণ করা যায়, সে দেশের পাসপোর্ট তত বেশি শক্তিশালী। বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে এ দেশের নাগরিকরা ৩৫টি দেশে বিনা ভিসায় ভ্রমণ করতে পারবে। যেমন বার্বাডোজ, ভুটান, বুরুন্ডি, জিবুতি বা ফিজি যেতে আমাদের কোনো ভিসা প্রয়োজন হবে না। একটি দেশ আরেকটি দেশের নাগরিকদের কখন ভিসাবিহীন ভ্রমণের অনুমতি দেয়, আর কী কারণেই বা কিছু কিছু দেশ ভিসা প্রদানের জন্য শত শত শর্ত জুড়ে দেয়, সেটি জানা প্রয়োজন। 

প্রথমত, বর্ডার কন্ট্রোলিং সিস্টেমে একজন আগন্তুক বা পর্যটকের প্রেডিক্টেবিলিটি ও রিস্ক প্রোফাইল যাচাই করা হয়। সে ক্ষেত্রে ব্যক্তি নয় বরং তাঁর জাতীয়তার পরিচয় মুখ্য হয়ে ওঠে। সেই দেশের নাগরিকদের আর্থিক অবস্থা, জীবনযাত্রার মান, বার্ষিক আয়, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক, বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা, সামাজিক নিরাপত্তা সব কিছু বিবেচনা করে যাচাই করা হয় ভ্রমণকারী যথাসময়ে নিজ দেশে ফিরে যাবে কিনা। কোনো কারণে যদি ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে এটি মনে হয়– ভ্রমণকারী ব্যক্তি এমন একটি দেশের নাগরিক, যারা আর্থিকভাবে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে; যাদের দেশে আইনশৃঙ্খলার অবস্থা বসবাসযোগ্য নয় এবং নাগরিকরা বেঁচে থাকার তাগিদে নিজ দেশ ত্যাগ করে অন্য দেশে অবৈধভাবে হলেও অভিবাসন সুবিধা নিতে পারে, সেই দেশের নাগরিকদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ শর্তাদি যুক্ত করা হয়। অপরদিকে উন্নত দেশের নাগরিকরা ভিসামুক্ত ভ্রমণ সুবিধা পায়। কারণ তাদের নাগরিকতার প্রতি, রাষ্ট্রের প্রতি একটি আন্তর্জাতিক আস্থা তৈরি হয়। একই সঙ্গে জড়িত থাকে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ। সিঙ্গাপুর, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকরা নিশ্চিতভাবেই অবৈধভাবে কোথাও আশ্রয় নেবে না– এটা নিশ্চিত। 

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এবং দেশের বাইরে আমাদের আর্থসামাজিক অবস্থা বিশ্ববাসীর কাছে নিজেদের ঝুঁকিপূর্ণ নাগরিক বলে সাক্ষ্য দেয়। যে কারণে ভিসামুক্ত ভ্রমণ সুবিধায় আমরা পিছিয়ে এবং নানাবিধ শর্ত দিয়ে দক্ষ-অদক্ষ কর্মী হিসেবে বা সাধারণ পর্যটক হিসেবেও ভ্রমণের ক্ষেত্রে অভিবাসন ও ভ্রমণকে করা হয়েছে জটিল। কূটনীতির ভাষায় ট্র্যাক টু এবং ট্র্যাক থ্রি ডিপ্লোম্যাসির কথা শোনা যায়। অর্থাৎ সরকারি দূতের বাইরেও আমরা প্রত্যেক নাগরিক নিজ দেশকে উপস্থাপন করি। আমাদের কাজ, মেধা বা প্রবাসে আমাদের সুনাম সামগ্রিকভাবে সরকারি দূতাবাসের ডিপ্লোম্যাসির চেয়েও ক্ষেত্রবিশেষে ভালো কাজ করে। আমরা প্রত্যেকেই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রকে উপস্থাপন করি। আমরা প্রত্যেকেই এ রাষ্ট্রের দূত। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কাজ ও আচরণের ভিত্তিতে বিদেশিরা বাংলাদেশকে চিনবে, তাকে মূল্যায়ন করবে। 

একজন জাপানি নাগরিকের কথা শুনলেই তার সম্পর্কে ভালো ধারণা জন্ম নেয়। জাপানের সরকার ও বেসরকারি উদ্যোগে তারা দেশের অভ্যন্তরে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পেরেছে, যা প্রমাণ করে– তারা নিজেদের দেশে বসবাস করে সন্তুষ্ট এবং অন্য দেশে অবৈধভাবে অবস্থান করবে না। একইভাবে দেশের বাইরে জাপানি নাগরিকদের আচরণ সর্বজন সমাদৃত। এ কারণে তাদের পাসপোর্ট বহন করে অনায়াসেই পৃথিবীর যে কোনো দেশে ভ্রমণ করা যায়; চাকরি ও ব্যবসা করা সহজ হয়। সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দিয়ো একে ‘সিম্বলিক ক্যাপিটাল’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। যা এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশন, ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি, ব্যবসায়িক ভ্রমণ, শ্রমিক হিসেবে অভিবাসন বা আন্তর্জাতিক যোগাযোগে বাস্তব সুবিধায় রূপান্তরিত হতে পারে।

অভিবাসনের ক্ষেত্রে পাসপোর্টের এ রকম রাজনৈতিক অর্থনীতির কাঠামোর ক্ষেত্রে আরও অনেক গভীর কারণ আছে বলে অনেকে মনে করেন, সেটি নিয়েও ভাবা যায়। স্টিফেন মাউ বা টরপেই-এর মতো রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করেন, পাসপোর্টের এ ধরনের মর্যাদার পার্থক্য আসলে এক ধরনের কলোনিয়ালিজম ও হেজেমনি তৈরি করে। এ পৃথিবীর নাগরিক হিসেবে একজন মানুষের ভ্রমণ ও অভিবাসনের অধিকারকে খর্ব করে। তারা একে বলেছেন, ‘গ্লোবাল মবিলিটি ডিভাইড’। এ কারণে তারা রাজনীতিবিদদের ও নীতিনির্ধারকদের দায়ী করেন। 

কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমেও সমস্যার তীব্রতা কমিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে প্রবাসে বাংলাদেশি যারা রয়েছে সেই সকল হোস্ট কান্ট্রির আইন মেনে চলার ব্যাপারেও হতে হবে যত্নশীল। বারংবার এবং ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিসার শর্ত ভঙ্গ হলে তার একটি ‘রেপুটেশনাল কস্ট’ বা ‘সুনাম ব্যয়’ তৈরি হয়। বাংলাদেশিদের জন্য বিশ্বব্যাপী অনেক সুযোগ অপেক্ষা করছে। সে সুযোগ গ্রহণ করতে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হবে নিজেদের শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশের মাধ্যমে; অর্থনীতির উন্নতি ঘটিয়ে এবং নৈতিক ও রাজনৈতিক দৃঢ়তা দিয়ে।

মো. সুমন জিহাদী: পিএইচডি ফেলো, এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, থাইল্যান্ড 
 

আরও পড়ুন

×