ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

বিএনপি: মানুষের সঙ্গে আগামীর পথে

বিএনপি: মানুষের সঙ্গে আগামীর পথে
×

আসাদুল হাবিব দুলু

আসাদুল হাবিব দুলু

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৮ | আপডেট: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বরে ভারত সফর করেছিলেন। তাঁর সম্মানে আয়োজিত ভোজসভায় ভারতের রাষ্ট্রপতি নীলম সঞ্জীবা রেড্ডি বলেছিলেন, ‘আপনার দেশের ইতিহাসের পাতায় একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আপনার স্থান ইতোমধ্যেই সুনিশ্চিত, যিনি সর্বপ্রথম বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। আপনি আপনার দেশের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশে এবং বিদেশেও ব্যাপক সম্মান অর্জন করেছেন– একজন এমন নেতা হিসেবে, যিনি দেশের অগ্রগতি ও জনগণের কল্যাণে সত্যিকারভাবে নিবেদিত’ (এম. শামসুল হক রচিত ‘বাংলাদেশ ইন ইন্টারন্যাশনাল পলিটিকস’, ১৯৯৩, পৃষ্ঠা ৯৬)।

স্বাধীনতার ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক নানা মত থাকলেও বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনে তিনি স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযোদ্ধা ও জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের প্রতীক। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পশ্চিম পাকিস্তানি জান্তা বাহিনী ঘুমন্ত নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় রক্তের হোলি খেলার তাণ্ডব। ঠিক তখন ইতিহাসের চরম সন্ধিক্ষণে চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এলো– ‘আমি মেজর জিয়া বলছি, আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।’ সংকটের সেই মুহূর্তে তাঁর ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও রাষ্ট্রের সংকট
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট, দুর্ভিক্ষ, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকট দেশকে গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বহুদলীয় গণতন্ত্রের অবসান এবং বাকশাল প্রতিষ্ঠা রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। চারটি  সংবাদপত্র বাদে সব পত্রিকা বন্ধ করা হয়। ‘রক্ষীবাহিনী’ ও ‘লাল বাহিনী’ গঠন করা হয়। বামপন্থি নেতা সিরাজ সিকদারসহ তৎকালীন হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও বিরোধীদের হত্যাকাণ্ড, চরম অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং মৌলিক অধিকার হরণ– স্বাধীনতার পরপরই দেশের মানুষকে এক শ্বাসরুদ্ধকর ও ভীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছিল, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী বিভীষিকার এক কালো অধ্যায়। এরপর নেমে আসে ’৭৪-এর নজিরবিহীন দুর্ভিক্ষ।

সেই সময়ের মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের জীবন সংগ্রামের একটি চিত্র পাওয়া যায় আহমদ ছফার লেখায়। তিনি লিখেছেন– ‘একদিকে উদ্ধত উলঙ্গ স্বৈরাচার, অন্যদিকে নির্মম দারিদ্র্য, বুভুক্ষা– এই দুইয়ের মাঝখানে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে অতি কষ্টে, অতি সন্তর্পণে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হচ্ছিল। ...কোনো কোনো পরিবারের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে। যারা দু’বেলা ভাত খেত দু’বেলা আটা খেয়ে জীবন কাটাচ্ছে। আবার অনেক পরিবারের দু’বেলা আটাও জোটে না।

অথচ শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনক্ষমতার সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের সুযোগ-সুবিধার অন্ত নেই। তাঁদের হাতে টাকা, ক্ষমতা সবকিছু যেন স্বাভাবিক নিয়মে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। আইন তাঁদের ধন-সম্পদ বৃদ্ধির সহায়, সরকারি আমলারা আজ্ঞাবহ মাত্র, সামাজিক সুনীতি, ন্যায়-অন্যায়, নিয়ম-কানুন কোনো কিছুর পরোয়া না করলেও তাঁদের চলে।’
সেই বিভীষিকাময় একদলীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় সিপাহি-জনতা স্বাধীনতার ঘোষক ও রণাঙ্গনের সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমানের দেশপ্রেম, সাহস ও নেতৃত্বের ওপর আস্থা স্থাপন করে।

৭ নভেম্বর ও বিএনপির যাত্রা
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরের রাজনৈতিক অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান বন্দি হন। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে তিনি মুক্ত হন এবং পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আসেন। বিএনপির রাজনৈতিক বয়ানে ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার ঐক্য ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতীক। পরে জিয়াউর রহমান রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জাতীয় ঐক্য জোরদার এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ সম্পর্কে বলেছেন, ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে দেশে যে গভীর রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করতেই জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন: একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে দেশে বহুদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা ছিল বিএনপির সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক সফলতা। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। এ বছর পালিত হচ্ছে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। 
দলটির মূল ভিত্তি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ দর্শন, যা দেশের সব ধর্ম, বর্ণ ও মতের মানুষকে একটি অবিভাজ্য জাতীয় ঐক্যের সূত্রে গেঁথেছে এবং বাঙালি পরিচয়কে আন্তর্জাতিকভাবে অনন্য রূপ দিয়েছে।

জিয়ার দূরদর্শিতা 
বিএনপির রাজনৈতিক মূল্যায়নে জিয়াউর রহমানের অন্যতম বড় অবদান অর্থনীতিতে বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করা এবং কৃষি ও উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া। তাঁর সময়েই অর্থনীতিতে নতুন কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টির চেষ্টা হয় এবং রাষ্ট্রের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ভূমিকা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি– গার্মেন্টস শিল্প এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের আনুষ্ঠানিক যাত্রা ও সুযোগ শহীদ জিয়ার হাত ধরেই শুরু হয়েছিল। দেশের কীর্তিমানদের স্বীকৃতি দিতে স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক চালু করেন তিনি। শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা অন্বেষণে বিটিভিতে ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতা চালু করেন। সাদাকালোর পরিবর্তে দেশে ‘রঙিন টিভি’ চালু হয় ১৯৮০ সালে, শহীদ জিয়ার সময়ে। ভারত-পাকিস্তানসহ উপমহাদেশে বাংলাদেশেই প্রথম রঙিন টিভি চালু হয়। নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণ, প্রবাসে কর্মসংস্থান এবং শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও তাঁর সময়ের নানা উদ্যোগ পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব রেখেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান বলেছিলেন: ‘গোটা বিশ্বে সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য গভীর আগ্রহ, আইনের শাসনের প্রতি নিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ে গভীর প্রজ্ঞার জন্য প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্মরণীয়।’

খালেদা জিয়া: গণতন্ত্রের সংগ্রামের প্রতীক
বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়ার ভূমিকা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব বিএনপিকে একটি শক্তিশালী গণভিত্তিসম্পন্ন রাজনৈতিক দলে পরিণত করে। লেখক মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর ‘খালেদা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, শুরুতে বিএনপি ছিল প্রচলিত অর্থে একটি রাজনৈতিক দল নয়; এরশাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দলটি মাঠ পর্যায়ে শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি অর্জন করে। পরবর্তী সময়েও খালেদা জিয়া নানা রাজনৈতিক সংকট, মামলা, কারাবরণ ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের দাবিতে অবস্থান নিয়েছেন– এটাই বিএনপির রাজনৈতিক বয়ানে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়।

বিএনপি: রাজপথ থেকে রাষ্ট্রচিন্তায়
বিএনপি নিজেকে কেবল একটি নির্বাচনী দল হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি গণভিত্তিক সংগঠন হিসেবে দেখতে চায়। গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আইনের শাসন ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করে। সেই পরিবর্তনের পর বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আন্দোলনের রাজনীতি থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার রাজনীতিতে সফলভাবে উত্তরণ। কারণ জনগণের আস্থা শুধু আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত হয় না; তা ধরে রাখতে প্রয়োজন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন।

শহীদ জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধারণ করে তারেক রহমান দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান করেও দলকে সাংগঠনিকভাবে ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ ও দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনি দলকে নতুন বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত করেছেন। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপির সামনে রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সেই সুযোগের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে জনগণের জীবনমানের উন্নতি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোনো একক দলের নয়। এ দেশের প্রত্যেক নাগরিকের। সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণে বিএনপি যদি জনগণের সঙ্গে থাকে, মানুষের কথা শোনে এবং প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব নীতিতে রূপ দিতে পারে, তবে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নতুন অর্থ পাবে।

আসাদুল হাবিব দুলু, এমপি: মন্ত্রী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা
ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়

আরও পড়ুন

×