ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নতুন অভিযানের সাফল্যে চীনকে লাগবে
ফাইল ছবি-সংগৃহীত
ডেভিড ই. স্যাঙ্গার
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯:১৩
গত সোমবার ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে এক নতুন ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ ঘোষণা করেছেন। এর মাধ্যমে তারা এক ব্যর্থ সামরিক অভিযান থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য আরও একটি কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছেন। এই প্রক্রিয়ায় তারা শত্রুপক্ষকে মার্কিন ইচ্ছার কাছে নতিস্বীকারে বাধ্য করার আগের পথ থেকে সরে আসছেন।
সাধারণত ওয়াশিংটন যখন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করার মতো কোনো সমস্যার মুখোমুখি হয়, তখন শুরুতেই বিবেচনায় থাকে কূটনীতি। তাতে কাজ না হলে ধাপে ধাপে বাড়ানো হয় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, যাতে কিছুটা চাপের উপাদান যুক্ত হয়। আর সামরিক হামলা থাকে একেবারে শেষ অস্ত্র হিসেবে। আর সেটি তখনই ঘটে, যখন প্রেসিডেন্ট নিশ্চিত হন যে সম্ভাব্য ফলের তুলনায় আমেরিকানদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলাটা যৌক্তিক।
কিন্তু ট্রাম্প সংক্ষিপ্ত এক দফা কূটনীতি থেকে সোজা বোমাবর্ষণে লাফিয়ে পড়েন। তাঁর লক্ষ্য ছিল ইরানকে ১১ টন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত পরিত্যাগ করতে বাধ্য করা এবং সম্ভবত দেশটির সরকারের পতন ঘটানো। ১৮ জন আমেরিকান সেনা এবং শত শত বা হাজার হাজার ইরানির প্রাণহানি ছাড়াও ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি খরচের পর আক্রমণের উভয় উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়েছে।
এখন ট্রাম্প এবং বেসেন্ট অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট নামে এক নতুন বিশাল পরীক্ষা চালিয়ে দেখার চেষ্টা করছেন। হোয়াইট হাউস এটাকে বর্ণনা করেছে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানকে টিকিয়ে রাখা প্রতিটি অবশিষ্ট অর্থনৈতিক জীবনরেখা ধূলিসাৎ করার এক অভূতপূর্ব অভিযান’ হিসেবে।
পরিকল্পনাটি একেবারে অসম্ভব, তা নয়। বেসেন্ট বর্ণনা করেছেন, এতে তেহরানে টাকাকড়ি পৌঁছানোর শেষ লেনদেনটুকুও বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে– তা সে ছদ্মবেশী ডিজিটাল লেনদেন হোক, জাহাজে জাহাজে তেল স্থানান্তর হোক কিংবা বিশ্বজুড়ে স্বর্ণ হাতবদলই হোক। সোমবার ট্রেজারিতে এক সংবাদ সম্মেলনে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার এই তৎপরতার প্রধান মুখ হয়ে ওঠা বেসেন্ট বলেন, ‘ইরানের সর্বশেষ প্রতিটি বিকল্প ধসিয়ে দেওয়ার জন্য এটি নিরবচ্ছিন্ন এক অভিযান।’
তবে এই প্রচেষ্টা এমন কিছু প্রশ্ন তুলছে, যা হোয়াইট হাউস এড়িয়ে গেছে। প্রথমত, যদি এই রকম কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ সম্ভবই ছিল, তবে ট্রাম্প মার্কিন সামরিক বাহিনীকে যুদ্ধে নামানোর আগে কেন তা প্রয়োগ করা হলো না? যুদ্ধ তো উল্টো মূল গোলাবারুদের ঘাটতি এবং মার্কিন সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতাকে উন্মোচিত করেছে।
আর এখন সামরিক বাহিনী যেহেতু সাফল্যের, বেসেন্টের ভাষায়, ‘ভিত্তি তৈরি করেছে’, সে ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা কী হবে? ২০২৫ সালে ইরানের মোট তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশেরই বেশি কিনেছে চীন। ট্রাম্প প্রশাসন কি বেইজিংয়ের সঙ্গে আরেকটি সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত, যার সঙ্গে ইতোমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তাইওয়ান, দ্রুত পারমাণবিক সম্প্রসারণ এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলা অতিরিক্ত উৎপাদন নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে?
১৯৪৪ সালে নরমান্ডির উপকূলে মূল ‘ডি-ডে’-তে চীনের অংশগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু এই অর্থনৈতিক ‘ডি-ডে’-তে তা দরকার। আর এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটনে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে আসার ঠিক এক মাস আগে চীন সেই সহায়তা করবে এমন কোনো ইঙ্গিত এখনও নেই। জর্জটাউন ল স্কুলের ভিজিটিং স্কলার পিটার হ্যারেল– যিনি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সীমা নিয়ে ব্যাপকভাবে লিখেছেন– গত সোমবার বলেন, ‘বিষয়টি বেশ জটিল হতে যাচ্ছে।’
হ্যারেলের মতে, চলতি বছরের শুরুর দিকে ইরানকে নতজানু করার সিদ্ধান্তকালে ট্রাম্পের সামনে দুটি পথ খোলা ছিল। ‘হয় চীনাদের ওপর কঠোর চাপ দেওয়া, যা তিনি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে নিজের অর্থনৈতিক এজেন্ডার কারণে করতে চাননি; আর না হয় ইরানি ট্যাঙ্কারগুলোর ওপর নৌ অবরোধ জারি করা।’
অবশ্য বার্লিন প্রাচীর পতনের সময়কার পরিস্থিতি ইরানের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। সেখানে কোনো বাহ্যিক সক্রিয় যুদ্ধ চলছিল না, ছিল কেবল স্নায়ুযুদ্ধের বাড়তে থাকা চাপ। আর পূর্ব জার্মানিসহ স্থানীয় অভ্যুত্থানগুলো দমনে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার সহযোগীরা খুব একটা আশার আলো দেখেনি– যা পরে বেসেন্টের দেওয়া ঐতিহাসিক তুলনার জন্ম দেয়।
তবে এটাই হয়তো ট্রাম্পের এই মুহূর্তের বড় বাজি। গত ফেব্রুয়ারিতে সোমবারের মতো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে সরাসরি সামরিক শক্তিতে চলে যাওয়ার ট্রাম্পের সিদ্ধান্তটি এক অর্থে এই স্বীকৃতি দেয় যে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ধীরগতিতে কাজ করে; আর ইতিহাস বলে তা প্রায়ই ব্যর্থ হয়। আজ অন্য কোনো কার্যকর বিকল্পের অভাবে তিনি আবার সেই পুরোনো পরিকল্পনায় ফেরত এসেছেন।
ডেভিড ই. স্যাঙ্গার: চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নিউইয়র্ক টাইমসে সাংবাদিক হিসেবে কর্মরত এবং পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের ওপর চারটি বই লিখেছেন; নিউইয়র্ক টাইমস থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- চীন
- ইরান
- ওয়াশিংটন ডিসি