ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

কৃষকের সংজ্ঞায় নারী কোথায়

কৃষকের সংজ্ঞায় নারী কোথায়
×

মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে ‘কৃষক’ শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে সাধারণত একজন পুরুষের ছবি ভেসে ওঠে– মাথায় গামছা, হাতে কোদাল বা কাস্তে নিজের বা বর্গা জমিতে কাজ করছেন। পরিশ্রমী, স্বল্প আয়ের অথচ দেশের খাদ্যভান্ডার ভরিয়ে রাখা এক মানুষ। এই ছবি আমাদের সাংস্কৃতিক কল্পনায় এতটাই শক্তিশালী, ‘নারী কৃষক’ বললে এখনও কারও কারও ভ্রু কুঁচকে যায়– ‘নারী আবার কৃষক!’ অথচ প্রশ্নটি হওয়া উচিত উল্টো– কৃষিতে এত কাজ করার পরও নারী কৃষক নন কেন?

বিবিএসের শ্রমশুমারি ২০২২ অনুযায়ী দেশের প্রায় দুই কোটি ৫৮ লাখ নারী শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ কৃষির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। কৃষি এখনও দেশের অন্যতম বৃহৎ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। কৃষি শ্রমশক্তির প্রায় ৫৮ শতাংশ নারী। তবু কৃষকের ছবিতে নারী কোথায়?

দেশের উদ্ভিদের জাত সংরক্ষণ আইন, ২০১৯-এ কৃষকের সংজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণভাবে জমির মালিকানার বাইরে গেছে। নিজের বা অন্যের জমিতে ফসল বা উদ্ভিদ চাষ, অন্যকে নিয়োগ করে সরাসরি চাষাবাদ তদারক করা অথবা বন্য প্রজাতি ও দীর্ঘদিনের চিরায়ত জাত সংরক্ষণ ও উন্নয়নে যুক্ত থাকা– এসব কাজে যুক্ত ব্যক্তিই কৃষক।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএওর চোখে নারী কৃষকের পরিচয় আরও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ এফএওর প্রশ্ন– ‘জমি কার’ নয়; বরং ‘খাদ্য ব্যবস্থায় অবদান রাখছেন কে?’ বাংলাদেশের নারী কৃষকের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। দেশের কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, নারীর হাত প্রায় সর্বত্র। বীজ নির্বাচন ও সংরক্ষণ, চারা উৎপাদন, রোপণ, নিড়ানি, ফসল পরিচর্যা ও সংগ্রহ– সব ক্ষেত্রেই নারী কাজ করছেন। এরপর শুকানো, বাছাই, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্য প্রস্তুত ও বাজারজাতকরণেও নারীর ভূমিকা রয়েছে।

নারী কৃষকের শ্রম হিসাব করতে শুধু মাঠের সময় গুনলে চলবে না। তার সারাদিনের কাজের পরিধিও বিবেচনায় আনতে হবে। বিবিএসের টাইম ইউজ সার্ভে ২০২১ দেখিয়েছে, নারীরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫.৯ ঘণ্টা অবৈতনিক গৃহস্থালি ও পরিচর্যার কাজে ব্যয় করেন; পুরুষের ক্ষেত্রে তা প্রায় ০.৮ ঘণ্টা। দেশে অবৈতনিক গৃহস্থালি ও পরিচর্যা কাজের আনুমানিক অর্থনৈতিক মূল্য জিডিপির ১৮.৯ শতাংশের সমপরিমাণ ছিল। এর প্রায় ৮৫ শতাংশ অবদান নারীর। তাহলে যে শ্রম জিডিপির এত বড় অংশের সমতুল্য মূল্য তৈরি করে, তাকে ‘কাজই করেন না’ বলা যায় কীভাবে? সেই গবেষণায় নারী কৃষকের স্থানীয় জ্ঞান যুক্ত না হলে বিজ্ঞান একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘জীবন্ত ডেটাবেজ’ হারাবে।

নারী কৃষকের কাজের সঙ্গে রয়েছে দীর্ঘ সময় ঝুঁকে থাকা, ভার বহন, পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ, অতিরিক্ত তাপ, ধারালো যন্ত্র ও কৃষি রাসায়নিকের ঝুঁকি। জলবায়ু পরিবর্তন এই চাপ আরও বাড়াচ্ছে। উপকূলে লবণাক্ততা ও নিরাপদ পানির সংকট, হাওরে আকস্মিক বন্যা, চরাঞ্চলে নদীভাঙন, উত্তর-পশ্চিমে খরা ও তাপপ্রবাহ এবং পার্বত্যাঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও ভূমিধস– প্রতিটি অভিঘাত নারীর কাজের চাপ বাড়ায়।
বাংলাদেশে কৃষক মানেই গামছা কাঁধে একজন পুরুষ– এ ছবি হয়তো আমাদের ঐতিহ্যের অংশ, কিন্তু কৃষির পূর্ণ ছবি নয়। নারী সেই ছবির প্রান্তে নন; কেন্দ্রেই আছেন। তাই কৃষক পরিচয়ের নতুন সূত্র হতে পারে– ‘জমির মালিকানা কৃষকের অধিকার; কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থায় অবদানই কৃষকের পরিচয়।’ ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নারী-কৃষক বর্ষ তাই শুধু নারীকে কৃষকের পাশে বসানোর বছর নয়; নারীকে কৃষকের সংজ্ঞার ভেতরে দৃশ্যমান করার বছর। কারণ যে নারী বীজ থেকে খাদ্য, খাদ্য থেকে পরিবার, কৃষি থেকে অর্থনীতি সচল রাখেন, তাঁকে কৃষক না বললে কৃষির সংজ্ঞাটিই অসম্পূর্ণ।

ড. মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন: কৃষিবিজ্ঞানী, বাংলাদেশ কৃষি
গবেষণা ইনস্টিটিউট 
[email protected] 
 

আরও পড়ুন

×