ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের কথা

শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের কথা
×

তালুকদার রিফাত পাশা

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

২৩ সেপ্টেম্বর পালিত হলো বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের সম্মান ও মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক ইশারা ভাষা দিবস। প্রতিবছর এই তারিখে দিবসটি পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মানবাধিকার ঘোষণা’। আমাদের দেশের জন্য এ বিষয়টি অনেক জরুরি। কারণ এখানে ইশারা ভাষা অনেকটা অবহেলিত। এই অবহেলার পেছনে রয়েছে আইনি ও প্রশাসনিক উদ্যোগের অভাব।

তথ্য বলছে, বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাষার অধিকার এবং এর মাধ্যমে তাদের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অনেক দেশ ইশারা ভাষাকে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে। ভারত ২০১৬ সালে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে যে আইন প্রণয়ন করেছে, সেখানে ইশারা ভাষা ব্যবহার বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে ধারা যুক্ত করেছে। অনুরূপ বিশ্বের ৮০টি দেশ ইশারা ভাষার আইনগত স্বীকৃতি দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছুটা পিছিয়ে। 

আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার নিয়ে যে আইন আছে, সেখানে কোনো ধারা উল্লেখ নেই, বরং ইশারা ভাষা তপশিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আইনের ধারা হলো মূল অংশ, যেখানে নির্দিষ্ট বিধান বা নিয়ম লেখা থাকে। আর তপশিল হলো আইনের সঙ্গে যুক্ত সংযোজনী অংশ, যেখানে বিস্তারিত তালিকা বা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়।

অর্থাৎ ধারা মূল নিয়ম নির্ধারণ করে, আর তপশিল সেই নিয়মকে কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করে। ফলে ইশারা ভাষা তপশিলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এটি আইনগতভাবে স্বীকৃত হলেও বাধ্যতামূলক নয়, যা বাস্তবে এর প্রয়োগকে দুর্বল করে দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় বাংলাদেশকে পিছিয়ে রেখেছে। তা ছাড়া দেশে ইশারা ভাষায় কোনো পাঠ্যবই নেই। ফলে শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চতর পর্যায়, কোথাও তাদের উপযোগী পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে না। একইভাবে তারা চিকিৎসাসেবা, আইনি সহায়তার মতো প্রয়োজনীয় অধিকার পাওয়া থেকে বঞ্চিত।
সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পরিচয়পত্র প্রদান করে সেই সুবর্ণ নাগরিক কার্ডধারী বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির বর্তমান সংখ্যা সাড়ে তিন লাখের কিছু বেশি। এই জনগোষ্ঠী তাদের নিজেদের ও অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ইশারা ভাষা ব্যবহার করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের নিজস্ব ইশারা ভাষা প্রণয়ন করেছে। আমাদের দেশে বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কোনো সরকারি স্বীকৃত ইশারা ভাষা নেই। সে কারণে এই জনগোষ্ঠী অন্য দেশের ইশারা ভাষা যেমন আমেরিকান সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করে থাকে।

১৯৯৪ সালে জাতীয় বধির ফেডারেশন একটি ইশারা ভাষা সহায়ক পুস্তিকা প্রকাশ করে। এর আর কোনো হালনাগাদ করা হয়নি। কয়েকটি সংগঠনের উদ্যোগে বাংলা ইশারা ভাষা প্রণয়নের চেষ্টা করা হলেও তা পূর্ণতা পায়নি। সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশে বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি কম হতে পারে। তাদের কষ্ট মোটেই কম নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বাংলা ইশারা ভাষা না থাকা। শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের এই কষ্ট দূর করার ক্ষেত্রে আমাদের সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। 

শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ বাংলা ইশারা ভাষা প্রণয়নের দায়িত্ব মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটকেই নিতে হবে। এই কাজ করার সময় শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠন, ইশারা ভাষা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, ইশারা ভাষা অনুবাদক এবং বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মতামত নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ইশারা ভাষা এবং এর অভিধান তৈরি করতে হবে।

তালুকদার রিফাত পাশা: অ্যাডভোকেসি অফিসার, ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবিইং বাংলাদেশ
[email protected] 
 

আরও পড়ুন

×