ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

বুলিংমুক্ত বিদ্যালয়, সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ

বুলিংমুক্ত বিদ্যালয়, সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ
×
×

ফাতেমা বেগম পপি ও নাজমুন সাকিব ইতি

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিবছর নভেম্বর মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার পালিত হয় ‘বিদ্যালয়ে সহিংসতা ও বুলিং প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক দিবস’। ইউনেস্কো ২০১৯ সালে দিবসটি ঘোষণা করে এবং ২০২০ সালে প্রথমবার এটি পালিত হয়। ২০২৬ সালের ‘প্রত্যেক শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা ও সুস্থতা: অঙ্গীকার থেকে বাস্তবায়নে’– এই প্রতিপাদ্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়; শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর পদক্ষেপও জরুরি। 

আমরা অনেক সময় বুলিংকে শিশুদের সাধারণ দুষ্টুমি বা ঠাট্টা বলে এড়িয়ে যাই। কিন্তু বারবার কাউকে অপমান, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা সামাজিকভাবে হেয় করা মোটেও নিরীহ আচরণ নয়। সম্প্রতি আমাদের এক আত্মীয়ের মেয়ে তার পরিবারের কাছে জানায়, এক সহপাঠী তাকে নিয়মিত বিরক্ত ও হেয় করছে। প্রথমে বিষয়টি শিশুদের সাধারণ ঝগড়া বা মতবিরোধ বলে মনে হলেও পরে স্পষ্ট হয়, বিষয়টি গুরুতর। কেননা, এটা দীর্ঘদিন ধরে চলেছে। এবং এখন শিশুটি স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। 

এই অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: কোনো শিশু যখন তার কষ্ট, ভয় বা অপমানের কথা জানায়, তখন তাকে নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। অনেক সময় একটি ছোট অভিযোগের আড়ালেই দীর্ঘদিনের ভয়, একাকিত্ব, অপমান বা অসহায়ত্ব লুকিয়ে থাকে।

শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদ শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের কথা বলে; ২৭ অনুচ্ছেদ সমতা; ৩১ অনুচ্ছেদ আইনের আশ্রয় ও আইনানুযায়ী আচরণ এবং ৩২ অনুচ্ছেদ জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করে। শিশু অধিকার সনদ, শিশু আইন, ২০১৩ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সংক্রান্ত নির্দেশনাও শিশুর মর্যাদা ও সুরক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে আইন ও নীতিমালা থাকলেই বিদ্যালয় নিরাপদ হয় না। বাস্তব প্রয়োগই মূল প্রশ্ন।

প্রথমত, প্রতিটি বিদ্যালয়ে বুলিংবিরোধী সুস্পষ্ট নীতিমালা এবং গোপনীয় অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগকারী শিশুর পরিচয় ও নিরাপত্তা সুরক্ষিত রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক ও বিদ্যালয়কর্মীদের বুলিং শনাক্তকরণ, অভিযোগ গ্রহণ এবং কার্যকর প্রতিক্রিয়া বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তৃতীয়ত, পাঠ্যক্রম ও বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন চর্চায় সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং বৈচিত্র্যের প্রতি গ্রহণযোগ্যতা গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, পরিবার ও বিদ্যালয়ের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিশুর আচরণে আকস্মিক পরিবর্তন, বিদ্যালয়ে যেতে অনীহা কিংবা আত্মবিশ্বাসের ঘাটতিকে অবহেলা করা যাবে না। পাশাপাশি বুলিংয়ের ঘটনা নথিবদ্ধ করে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।

ইউনেস্কোর গবেষণা বলছে, বিদ্যালয়ে বুলিং কমাতে রাজনৈতিক অঙ্গীকার, কার্যকর নীতিমালা, শিক্ষক ও অভিভাবকের অংশীদারিত্ব এবং শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু দিবস পালন বা সচেতনতামূলক প্রচারণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উদ্যোগ। মনে রাখতে হবে, শুধু বুলিংয়ের শিকার শিশুকে নয়, যে শিশু বুলিং করছে তাকেও বোঝার চেষ্টা করতে হবে। অনেক সময় তার নিজের মধ্যেও নানা মানসিক বা সামাজিক সমস্যা কাজ করে। তাই তাকেও সংশোধন ও ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ দিতে হবে। 

বিদ্যালয়ের সাফল্য শুধু পরীক্ষার ফল কিংবা পাসের হার দিয়ে মাপা যায় না। শিশুরা কতটা নিরাপদে, সম্মানের সঙ্গে এবং আনন্দ নিয়ে শিখছে, সেটিও শিক্ষার অপরিহার্য মানদণ্ড। যে বিদ্যালয়ে শিশু ভয় পায়, সেখানে তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। তাই বুলিংমুক্ত বিদ্যালয় গড়ে তোলা কোনো ঐচ্ছিক উদ্যোগ নয়; এটি শিশুর অধিকার, রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ নির্মাণের শর্ত।

ফাতেমা বেগম পপি: সহকারী অধ্যাপক, শিক্ষা বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়; নাজমুন সাকিব ইতি: প্রভাষক,
আইন বিভাগ, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×