ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

সাক্ষীর সুরক্ষা

মানিক পশারীর পর দুলাল মিয়া

মানিক পশারীর পর দুলাল মিয়া
×
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

সুনামগঞ্জে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষী দুলাল মিয়ার বাড়ি ও দোকানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের যেই অভিযোগ উঠিয়াছে, উহা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, বৃহস্পতিবার রাত্রে জেলার শাল্লা উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে দেশীয় অস্ত্র লইয়া ১৫ হইতে ২০ জনের একটি দল দুলাল মিয়ার বাড়ি ও দোকানে ভাঙচুর ও লুণ্ঠন চালায়। হামলায় নারী-শিশুসহ অন্তত পাঁচজন আহত হইয়াছেন। উপরন্তু দুলাল মিয়া বাড়িতে না থাকিলেও হামলার পর হইতে তিনি নিখোঁজ বলিয়া অভিযোগ করিয়াছেন স্বজনরা। যেই কোনো মামলায় ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে সাক্ষ্য-প্রমাণের গুরুত্ব অপরিসীম। সাক্ষীর অভাবে অসংখ্য মামলা বিশেষত ফৌজদারি আদালতে দশকের পর দশক ঝুলন্ত। যাহার ফলে যদ্রূপ বাদীপক্ষ ন্যায়বিচার হইতে বঞ্চিত থাকিতেছেন, তদ্রূপ আসামিপক্ষও অনেক ক্ষেত্রে কারাগারে বিনা বিচারে বৎসরের পর বৎসর অন্তরীণ। এমতাবস্থায় নিছক একটি মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে দুলাল মিয়ার পরিবারের ওপর হামলা হওয়ার সামগ্রিক পরিণতি ভয়াবহ হইতে বাধ্য। 

অস্বীকার করা যাইবে না, অনেকে ফৌজদারি অপরাধের প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার পরও আদালতে সাক্ষ্য দিতে সম্মত হন না পরবর্তী সময়ে প্রতিপক্ষের হস্তে হেনস্তা হইবার ভয়ে। এমনকি অনেক সময় সমন ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করিয়াও সাক্ষীদের হাজির করা যায় না। হাজির হইলেও তাহারা ভয়ে সত্য কথা বলিতে চাহেন না। অপরাধীরা যদি নিশ্চিত হয়– জানমালের ভয়ে কেহ উহাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে যাইবে না, তাহা হইলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাও সুদূর পরাহত; বলা যায়। 

প্রতিবেদনমতে, দুলাল মিয়া একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মামুদ আলীর ছেলে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবারটির সাত সদস্য ও আত্মীয় শহীদ হইয়াছিলেন। ফলে ২০১৬ সালে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুলাল মিয়ার সাক্ষ্য দেওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু নহে। কিন্তু দেশে সাক্ষীদের কোনো রক্ষাকবচ না থাকায় দুলাল মিয়াকে শেষ পর্যন্ত আলোচ্য হামলার শিকার হইতে হইল। জানা গিয়াছে, ঐ মামলায় দুলাল মিয়ার সহিত অন্য যাহারা সাক্ষ্য দিয়াছিলেন; আসামিপক্ষের হুমকিতে তাহাদের অনেকেই বর্তমানে প্রাণ বাঁচাইতে পালাইয়া বেড়াইতেছেন। বিস্ময়কর হইল, দুলাল মিয়া পুলিশের সাহায্য চাহিলেও কার্যত পাওয়া যায় নাই। যেমন বৃহস্পতিবার পুলিশ গ্রামে গিয়া নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়াছিল বলিয়াই দুলাল মিয়ার জামাতা দোকান খোলেন। কিন্তু হামলার পর পুলিশ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে নাই। সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার উক্ত বিষয়ে কিছুই অবগত নহেন না বলিয়া সমকালের প্রতিবেদকে বলিয়াছেন। অন্যদিকে শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ভুক্তভোগীদের মামলা করার পরামর্শ দিয়াই দায়িত্ব আপাতত সম্পাদন করিয়াছেন। যেই কোনো ফৌজদারি অপরাধে পুলিশ নিজেও মামলা করিতে পারে বলিয়া আমরা জানি। তদুপরি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণে ক্ষেত্রবিশেষে মামলারও প্রয়োজন হয় না। অথচ উক্ত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পরিবারটির আতঙ্ক দূরীকরণে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ না লইয়া মামলার জন্য অপেক্ষা করিতেছেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেক মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে আমরা সম্প্রতি পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর লাশ দাফনে বিশেষ মহলকে বাধা দিবার ন্যায় ন্যক্কারজনক ঘটনা দেখিয়াছি। অর্থাৎ অবিলম্বে সাক্ষীর সুরক্ষায় আইনি ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক পদক্ষেপ গৃহীত না হইলে এইরূপ উদাহরণ বৃদ্ধিই পাইবে।

আরও পড়ুন

×